নাটোরে ১৫ বছর পর অবৈধ বাঁধ অপসারনে উল্লাসিত ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৯, ২০২০; সময়: ৫:৫১ অপরাহ্ণ |
নাটোরে ১৫ বছর পর অবৈধ বাঁধ অপসারনে উল্লাসিত ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, নাটোর : অবশেষে দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর পর নাটোরের দিঘাপতিয়া ইউনিয়নের বলদখাল ও মরা আত্রাই নদীর পদ্মবিলের সংযোগ স্থলের বাঁধ অপসারন শুরু করেছে উপজেলা প্রশাসন। শনিবার থেকে গাঙ্গইল ও বলদখাল এলাকায় অবৈধ ভাবে নদী দখল করে তৈরি করা পুকুরের এসব বাঁধ অপসারন শুরু করা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাহাঙ্গির আলম,উপজেলা ভুমি কর্মকর্তা আবুল হাসান ও দিঘাপতিয়া ইউপি চেয়ারম্যান ওমর শরীফ চৌহান সহ স্থানীয় অন্যান্য জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ব্যক্তি বর্গের উপস্থিতিতে এই অপসারন অভিযান চালানো হয়। নদী দখল করে তৈরি করা এসব বাঁধ অপসারন করা হলে পদ্মবিলের প্রায় দুই হাজার বিঘা তিন ফসলি জমি স্থায়ী জলাবদ্ধ নিরসন সহ সাত গ্রামের ক্ষতিগ্রস্থ প্রায় একহাজার কৃষক উপকৃত হবেন। প্রশাসনের এই উচ্ছেদ কার্যক্রমে উল্লসিত হয়েছেন ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা।

সদর উপজেলা ভুমি কর্মকর্তা আবুল হাসান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কিছু অসাধু ব্যক্তি দিঘাপতিয়া ইউনিয়নের বলদখাল এলাকায় মরা আত্রাই নদী দখল করে বাঁধ দিয়ে পুকুর বানিয়ে মাছ চাষ করে আসছিল। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বন্ধ হয়ে গেছে। এর কারনে নদীসংলগ্ন পদ্মবিলসহ আশেপাশের কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। ক্ষতিগ্রস্থদের আবেদনের প্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশে অবৈধভাবে তৈরি করা বাঁধ কেটে জলবদ্ধ পানি নিস্কাসনের জন্য পথ তৈরি করা হয়। তবে উচ্ছেদ কার্যক্রমের আগে দখলকারীদের নোটিশ দিয়ে বাঁধ অপসারনের নির্দেশ দেয়া হয়।

দিঘাপতিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওমর শরীফ চৌহান বলেন, কিছু ব্যক্তি দীর্ঘ কয়েক বছর আগে এই ইউনিয়নের বলদখাল এলাকায় মরা আত্রাই নদী দখল করে পুকুর বানিয়ে মাছ চাষ শুরু করে। এতে করে নদী সংলগ্ন পদ্মবিলসহ আশে পাশের প্রায় দুই হাজার বিঘা তিন ফসলি জমি থেকে পানি নিস্কাসনের পথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পদ্মবিল এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হলে গত প্রায় ১৫ বছর ধরে এসব তিন ফসলি জমি অনাবাদি অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বিল সংলগ্ন গাঙ্গইল, কাকবাড়িয়া,বলদখাল,ধরাইল,ডাঙ্গাপাড়া,গোয়ালদিঘী ও বামন গাঙ্গইল গ্রামের প্রায় এক হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। গৃহস্থসহ কৃষি কাজে জড়িতদের অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েন।

এলাকাবাসী সুত্রে জানা যায়, সদর উপজেলার দিঘাপতিয়া ইউনিয়নের গাঙ্গোইল, বলদখাল, কাকবাড়িয়া, ডাঙ্গাপাড়া, বাগবাড়িয়া ও ধরাইল এলাকায় সরকারী বলদখাল ও মড়া আত্রাই নদী দখল করে পুকুর বানিয়ে মাছ চাষ করেন গোবিন্দপুর গ্রামের নিজাম উদ্দিন ও আজম আলীসহ এলাকার কয়েকজন প্রভাবশালী। তাদের দেখাদেখি অন্যরাও নিজেদের জমি কেটে পুকুর করেন। নদী ও খাল দখল করে পুকুর করার কারনে পদ্মবিলের পানি বের হতে পারছেনা অন্তত পনর বছর ধরে। ফলে পদ্মবিলে সৃষ্টি হয়েছে স্থায়ী জলাবদ্ধতা। পানি নিস্কাসনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই বিলে এখন আর আবাদ হয়না।

চাষাবাদ করতে না পেরে অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। বিষয়টি নিয়ে এমপি- মন্ত্রী সহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেও প্রতিকার পাওয়া যায়নি দীর্ঘদিনেও। সম্প্রতি জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে বিলের জলাবদ্ধ পানি নিস্কাসনের ব্যবস্থা করে জমিগুলো দ্রুত চাষের আওতায় আনার আবেদন জানানো হয়। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রশাসন শনিবার অভিযান চালিয়ে অবৈধ বাঁধ অপসারন শুরু করলে এলাকার ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের মুখে হাসি দেখা দেয়।

সদর উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের মহবতুল্লার ছেলে নিজাম উদ্দিন জানান,তিনি ১৯৭৪ সালে কবুলত দলিল সম্পাদন করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে রাজস্ব বিভাগের মাধ্যমে নদীর শ্রেণীকে মাছ চাষের জন্য পুকুর শ্রেণীতে পরিবর্তন করা হয়েছে। একই এলাকার আবুল হোসেনের ছেলে আজম আলী বলেন তিনিও একইভাবে দেড় একর জমি কবুলত দলিল সম্পাদন করেছেন। তারা অবৈধ দখলকারী নন। তারা বর্তমান জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশ মেনে নিয়েছেন। তবে হঠাৎ করে বাঁধ কেটে দেয়ায় তারা ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

দিঘাপতিয়া ইউনিয়ন ভুমি অফিসের সহকারী ভুমি কর্মকর্তা (তহমীলদার) আব্দুল মান্নান বলেন, বাগবাড়িয়া এবং বলদখালের দু’টি মৌজায় এই নদী ও খাল বহু বছর আগে অবৈধভাবে পত্তন দিয়েছে রাজস্ব বিভাগ। সম্প্রতি ওই অবৈধ পত্তন বাতিলের জন্য প্রতিবেদন দাখিল করেন। বিষয়টি উর্ধতন কতৃপক্ষকেও অবহিত করার পর প্রশাসনের উর্ধতন কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে সত্যতা পান। পরে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনানুযায়ী বাঁধ অপসারন কার্যক্রম শুরু করা হয়।

গাঙ্গোইল গ্রামের ক্ষতিগ্রস্থ সাইদুল ইসলাম বলেন,পদ্মবিলে তার ৬ বিঘার তিন ফসলি জমি চাষ করে স্ত্রী সন্তান নিয়ে বেশ সুখেই দিন কাটাচ্ছিলেন। কিন্তুনদী দখল করে মাছ চাষ করায় পদ্মবিলের পানি বের হতে না পেরে জমিগুলোতে পানি জমে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। ফলে গত প্রায় এক যুগ ধরে এসব জমিতে আর আবাদ করতে না পেরে ঘরে ফসল তুলতে পানেনি। নিজের জমি পতিত হয়ে পড়াই এবং দীর্ঘদিন কাজ না থাকায় কষ্টে জীবন যাপন করতে হচ্ছিল। শনিবার উপজেলা প্রশাসন বাঁধ কেটে দেয়ায় পদ্মবিলের পানি নামতে দেখে আবার নিজের জমি চাষ করে ফসল ঘরে তোলার আশা জেগেছে ।

গাঙ্গইল ও বামনগাঙ্গইল গ্রামের ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক আশরাফুল ইসলাম, আমজদ হোসেন, হাবিবুর রহমান ও আমজাদ হোসেন বলেন, তাদের প্রায় দেড়শ বিঘা জমি গত ১৫ বছর ধরে জলমগ্ন অবস্থায় পতিত অবস্থায় পড়ে ছিল। প্রভাবশালীরা মরা আত্রাই নদীতে জবর দখল করে পুকুর বানিয়ে মাছ চাষ করার কারনে পদ্মবিলের পানি এই নদী দিয়ে বের হতে না পেরে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টে করে।

জনপ্রতিনিধি,সরকারী কর্মকর্তাসহ আদালতে মামলা করেও প্রতিকার পাননি তারা। দীর্ঘদিন এসব জমিতে চাষ করতে পারেননি। এসব জমি থেকে এক সময় প্রায় দুই হাজার মন ধান ও অন্যান্য ফসল ঘরে তুলেছেন। প্রায় ১৫ বছর পর বর্তমান প্রশাসন নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ায় তারা আবারও জমিতে চাষাবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অনেকদিন পর এবার তারা পানিতে তলিয়ে গিয়ে পতিত হওয়া জমিতে বোরো ধান চাষ করবেন। তারা বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান ওমর শরীফ চৌহানের উদ্দোগের প্রশংসা করে তার দীর্ঘায়ু কামনা করেন। একইসাথে বর্তমান উপজেলা প্রশাসনকে ধন্যবান জানান তারা।

সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তিনি সম্প্রতি এই উপজেলায় যোগদান করেছেন।স্থানীদের দাবীর প্রেক্ষিতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নদীতে পুকুর করে মাছ চাষ করার সত্যতা পান তিনি। তদন্ত করে দেখা যায়, নদী দখল করে অবৈধ ভাবে গড়ে তোলা হয়েছ বেশ কিছু পুকুর। এতে নদীটি একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। শনিবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে অন্তত সাতটি পুকুরের পাড়ের বাঁধ কেটে পানি প্রবাহের পথ তৈরি করা হয়েছে। এই প্রতিবন্ধক অপসারন কাজ স¤পুন্ন হলে পদ্মবিলের প্রায় দুই হাজার বিঘা জমির জলাবদ্ধতা নিরসন হবে।

জেলা প্রশাসক মোঃ শাহরিয়াজ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নদ-নদী থেকে সকল অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। যেসব খাল বা নদীতে মাছ চাষের নামে দখল করে পানি নিস্কাশনের পথ বন্ধ করা তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করা হয়। পদ্মবিলের পানি নিস্কাসনের সকল প্রতিবন্ধক অপসারন কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা যাতে আবারও তাদের জমিতে চাষাবাদ করতে পারে সেদিকে সার্বক্ষনিক নজর রাখতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
topউপরে