প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হওয়ায় ওসি ক্লোজড

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৮, ২০২০; সময়: ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ |

নিজস্ব প্রতিবেদক, নাটোর : নাটোর শহরের চকরামপুরে একটি বেসরকারী হাসপাতালের অর্থব্যবস্থাপক (সেবিকা) মিতা খাতুন (২৮) হত্যার ঘটনায় মূল অভিযুক্তকে অব্যাহতির সুপারিশ করে তদন্তকারী কর্মকর্তার দেয়া মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এবং তা মঞ্জুর করায় অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে চাওয়া ব্যাখ্যা জমা দেয়া হয়েছে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে।

ব্যাখ্যায় ১৬৪ ধারায় দেয়া আসামীর জবানবন্দী তদন্তে অভিযুক্ত হত্যাকারীকে কেন অবাহ্যতি দেয়ার সুপারিশ করা হয় তা জানানো হয়েছে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে। আদালতের বিচারক জেলা ও দায়রা জজ আব্দুর রহমান সরদার নাটোর জেনারের হাসপাতালের অর্থব্যবস্থাপক মিতা খাতুন (২৮) হত্যা মামলার প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করতে ব্যার্থ হওয়ায় নাটোর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) ১১ ফেব্রুয়ারী আদালতে স্বশরীরে হাজির হয়ে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়েছেন। মামলার প্রধান আসামি ছিলেন হাসপাতালের মালিক আজিজ মোল্লা।

সোমবার দুপুরে এই আদেশ দেওয়ার সময় মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা মাসুদ রানা ও অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট মামুনুর রশিদ নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে আদালতে ব্যাখ্যা দাখিল করেছেন। গত বছরের ২১শে ডিসেম্বর হত্যা মামলার প্রধান আসামীকে অব্যাহতির সুপারিশ করায় তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং তা মঞ্জুর করায় অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে এর ব্যাখ্যা চান জেলা ও দায়রা জজ আবদুর রহমান সরদার। সোমবার নির্ধারিত দিনে ব্যাখাটি আদালতে দাখিল করা হয়।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলী (পিপি) এডভোকেট সিরাজুল ইসলাম ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ সৈকত হাসান।

জানা যায়, ২০১৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর সকালে শহরের চকরামপুরের জেনারেল হাসপাতালের পঞ্চম তলায় ছুরিকাঘাতে খুন হন হাসপাতালের সেবিকা ও নলডাঙ্গা উপজেলার নশরতপুর গ্রামের লাল মোহম্মদের মেয়ে মিতা খাতুন। তিনি সেবিকার পাশাপাশি ওই হাসপাতালের অর্থ ব্যবস্থাপক হিসেবেও কর্মরত ছিলেন। হত্যাকান্ডের পর নিহত মিতার ভাই শোয়েব হোসেন একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার তদন্তভার দেয়া হয় জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পরিদর্শক মাসুদ রানাকে। তদন্ত চলাকালীন জড়িত সন্দেহে পুলিশ ওই হাসপাতালের সুইপার সাগর জমাদারকে আটক করে। আটক সাগর জমাদার হত্যাকান্ডে নিজের আংশিক সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।

ওই জবানবন্দীতে সাগর জানান, মিতার আসল হত্যাকারী হাসপাতালের সত্বাধিকারী আজিজ মোল্লা। হত্যার কারন আজিজ মোল্লার অবৈধ সম্পর্ক। হত্যার বর্ণনায় সাগর বলেন, ওইদিন সকালে আজিজ মোল্লার ডাকে তিনি হাসপাতালেন পঞ্চম তলায় যান। সেখানে অপেক্ষমান মিতার সাথে আজিজ মোল্লার কথা কাটাকাটি হয়। এর এক পর্যায়ে সার্জিকাল ছুরি দিয়ে আজিজ মোল্লা মিতার গলায় পোচ দেন। পরে আজিজের নির্দেশ অনুসারে তিনি মিতার গলায় দ্বিতীয় পোচ দেন। মৃত্যু নিশ্চিত হলে আজিজ দরজা দিয়ে এবং তিনি জানালা দিয়ে পালিয়ে যান। এই জবানবন্দির ভিত্তিতে আজিজ মোল্লাকে গ্রেফতার করা হয়।

২০১৯ সালের ২৮ জুলাই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শুধু সাগর জামাদারকে আসামী করে এবং আজিজ মোল্লাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্র গ্রহণ করে বিচারক মামুনুর রশীদ আজিজকে অব্যহতি দেন। ২০ নভেম্বর বিষয়টি আদালতের নজরে আসলে আদালত তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তার ব্যাখ্যা তলব করেন। একই সঙ্গে অব্যাহতির সুপারিশ কেন মঞ্জুর করা হয়েছে,সে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেন নাটোরের অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট মামুনুর রশিদকে। একই সময় আদালত হাসপাতালের মালিক আজিজ মোল্লাকে ২৭ জানুয়ারীর মধ্যে গ্রেপ্তার করার জন্য নাটোর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ওসি ওই নির্দেশ পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এর কারণ ব্যাখ্যা করার জন্য সোমবার আদালত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে আগামি ১১ ফেব্রুয়ারী মামলার পরবর্তী তারিখে স্ব-শরীরে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

তবে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী জালাল উদ্দিন সোমবার সন্ধায় জানান,তিনি এ ব্যাপারে আদালতের নির্দেশ হাতে পাননি। আদেশ পেলে অবশ্যই ব্যাখ্যা দিবেন।

কি কারণে অভিযুক্ত আসামীকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হলো জানতে চাইলে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ সৈকত হাসান বলেন, হাসপাতাল মালিক আজিজ মোল্লাকে ফাঁসানোর জন্য জবানবন্দীতে তাকে মূল হত্যকারী বলেন সাগর জমাদার। তদন্তে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। জবানবন্দীতে সাগর মিতার গলায় দুজনের পোচ দেয়ার কথা জানালেও মরদেহের ময়না তদন্তের পর দেখে গেছে গলায় একটি পোচ দেয়া হয়। ঘটনার দিন সিসিটিভি ফুটেজ থেকে দেখা যায়, হত্যাকান্ডের আগে সিড়ি দিয়ে ভবনের পাঁচ তলায় শুধু সাগর জমাদারই উঠেছিল এবং হত্যাকান্ড সংঘটনের পর আজিজ মোল্লা সেখানে যান। জবানবন্দী ও তদন্তের বৈসাদৃশ্যের কারণে আজিজ মোল্লাকে অব্যাহতির সুপারিশ করে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়। আদালতের প্রতি সম্মান জানিয়ে এ কথাগুলোই ব্যাখ্যা হিসেবে দাখিল করা হয়েছে।

১৬৪ ধারার জবানবন্দীর আলোকে তদন্ত প্রতিবেদন না হওয়ার পরও অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটে কর্তৃক অভিযোগপত্র গ্রহন ও অব্যাহতির সুপারিশ কেন জেলা ও দায়রা জজ আদালত কর্তৃক প্রশ্নবিদ্ধ হলো সে সম্পর্কে রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলি এডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বলেন, অভিযোগপত্র বা অভিযুক্ত আজিজ মোল্লার সম্পৃক্ততার ব্যাপারে মামলার বাদীর কোন আপত্তি ছিলো না। আপত্তি থাকলে অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারকের পুনঃতদন্তের নির্দেশ দিতেন। নিয়মানুযায়ী পুনঃতদন্তের সুযোগ না থাকায় বিচারক আজিজ মোল্লাকে অব্যাহতির সুপারিশ করেন।

এদিকে আদালতের আদেশ মোতাবেক তদন্তকারি কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপ পরিদর্শক মাসুদ রানা ও অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট মামুনুর রশিদ সোমবার তাঁদের লিখিত ব্যাখ্যা দাখিল করেছেন। তদন্ত কর্মকর্তা তাঁর লিখিত ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেন, একজন নির্দোষ ব্যক্তি যাতে সন্দেহপূর্ণভাবে বিচারে সোপর্দ না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে আসামি আজিজ মোল্লাকে অব্যাহিত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। যা তদন্ত তদারকি কর্মকর্তাগণও সমর্থন করেছেন।’ তবুও তিনি নবীন তদন্তকারি কর্মকর্তা হওয়ায় তাঁর ত্রুটি বিচ্যুতির জন্য বিচারকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট মামুনুর রশিদ তাঁর লিখিত ব্যাখ্যায় বলেন, এজাহারে কোন আসামির নাম উল্লেখ নাই। তদন্তকারি কর্মকর্তা তদন্ত করে সন্দিগ্ধ আসামি আজিজ মোল্লাকে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়ায় এবং এ ব্যাপারে এজাহারকারি, কোর্ট ইন্সপেক্টর কোনো আপত্তি না করায় সার্বিক বিবেচনায় সরল বিশ্বাসে আমি অভিযোগপত্র গ্রহণ করি। প্রথমবার বিধায় মহোদয়ের নিকট নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং ভবিষ্যতে এ ধরণের আদেশ দানের ক্ষেত্রে আরো বেশী সতর্ক থাকবো মর্মে নিশ্চয়তা দিচ্ছি।’

আদালত উভয়ের লিখিত ব্যাখ্যা নথিতে রাখার নির্দেশ দেন এবং এ ব্যাপারে আগামি ১১ ফেব্রুয়ারী মামলার পরবর্তী তারিখে আদেশ দেবেন বলে জানান।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
topউপরে