হাসি মুখে ফাঁসি মেনে নেওয়া বিপ্লবী ক্ষুদিরামের জন্মদিন আজ

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩, ২০২১; সময়: ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ |
হাসি মুখে ফাঁসি মেনে নেওয়া বিপ্লবী ক্ষুদিরামের জন্মদিন আজ

পদ্মাটাইমস ডেস্ক :

‘চিনতে নাকি সোনার ছেলে

ক্ষুদিরামকে চিনতে?
রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিল যে
মুক্ত বাতাস কিনতে’

কবি আল মাহমুদের মুক্ত বাতাস কিনতে প্রাণ দেওয়া সোনার ছেলের নাম ক্ষুদিরাম বসু। প্রায় দুইশ বছর ব্রিটিশ শাষকদের হাত থেকে মুক্তি পেতে আন্দোলন সংগ্রামে যারা ভূমিকা ছিল অগ্রগামী। যারা অস্ত্র হাতে অত্যাচারী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে প্রাণ দিয়েছিল সেই তালিকার শুরুর দিকে রয়েছে ক্ষুদিরাম বসুর নাম।

ক্ষুদিরাম বসুর জন্মদিন আজ। ১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর মেদেনীপুর জেলার হাবিবপুর গ্রামে তিনি জন্ম নিয়েছিলেন। তার বাবা ত্রৈলক্যনাথ বসু এবং মা লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী। ক্ষুদিরাম নামকরণের পেছনেও রয়েছে একটি গল্প। তিন মেয়ে সন্তান জন্মের পর তিনি ছিলেন চতুর্থ সন্তান।

তার আগেই দুই ছেলে জন্মের পরেই মারা গিয়েছিল। এর ফলে জন্মের পরই তিন মুঠ ক্ষুদের বিনিময়ে তাকে তার দিদির কাছে দেন। এর থেকে তার নাম হয় ক্ষুদিরাম। ১৮৯৫ সালে তার মা-বাবা মারা যায়। পরে তার বড় বোন অপরূপা তাকে প্রতিপালনের দায়িত্ব নেন।

গ্রামের বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষার পর তমলুকের ‘হ্যামিল্টন’ স্কুল ও তারপর ১৯০৩ সালে মেদিনীপুরের ‘কলেজিয়েট’ স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত তিনি লেখাপড়া করেন। পড়ালেখায় মেধাবী হলেও কিশোরোচিত দুরন্তপনা ও দুঃসাহসিক কার্যকলাপের প্রতি তার ঝোঁক ছিল।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ও স্বদেশী আন্দোলন ক্ষুদিরামের মতো স্কুলের ছাত্রদেরও প্রভাবিত করে এবং পরিণামে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে সত্যেন বসুর নেতৃত্বে এক গুপ্ত সমিতিতে যোগ দেন। আরও কয়েকজনের সঙ্গে সেখানে তিনি শরীরচর্চার সঙ্গে সঙ্গে নৈতিক ও রাজনৈতিক শিক্ষা পেতে শুরু করে।

এ সময়ে পিস্তল চালনাতেও তার হাতেখড়ি হয়। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে ইংল্যান্ডে উৎপাদিত কাপড় পোড়ানো ও ইংল্যান্ড থেকে আমদানিকৃত লবণে বোঝাই নৌকা ডোবানোর কাজে ক্ষুদিরাম অংশ নেন।

তার ভেতরে স্বদেশের চেতনা জন্ম নিতে সময় নেয়নি। ১৯০৬ সালের মার্চে মেদিনীপুরের এক কৃষি ও শিল্পমেলায় রাজদ্রোহমূলক ইস্তেহার বণ্টনকালে ক্ষুদিরাম প্রথম পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

পরবর্তী মাসে অনুরূপ এক দুঃসাহসী কাজের জন্য তিনি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন এবং আদালতে বিচারের সম্মুখীন হন। কিন্তু অল্প বয়সের বিবেচনায় তিনি মুক্তি পান।

১৯০৭ সালে হাটগাছায় ডাকের থলি লুট করা এবং ১৯০৭ সালের ৬ ডিসেম্বর নারায়ণগড় রেল স্টেশনের কাছে বঙ্গের ছোটলাটের বিশেষ রেলগাড়িতে বোমা আক্রমণের ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। একই বছরে মেদিনীপুর শহরে অনুষ্ঠিত এক রাজনৈতিক সভায় সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যপন্থি রাজনীতির বিরুদ্ধে তিনি বিক্ষোভ করেন।

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ও স্বদেশী আন্দোলনের কর্মীদের প্রয়োজনভিত্তিক কঠোর সাজা ও দমননীতির কারণে কলকাতার প্রধান প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড বাঙালিদের অত্যন্ত ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। যুগান্তর বিপ্লবীদল ১৯০৮ সালে তাঁকে হত্যার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরামের উপর এ দায়িত্ব পড়ে।

কর্তৃপক্ষ কিংসফোর্ডকে কলকাতা থেকে দূরে মুজাফ্ফরপুরে সেশন জাজ হিসেবে বদলি করে দিয়েছিলেন। দুই যুবক ৩০ এপ্রিল স্থানীয় ইউরোপীয় ক্লাবের গেটের কাছে একটি গাছের আড়ালে অতর্কিত আক্রমণের জন্য ওত পেতে থাকেন।

কিন্তু কিংসফোর্ডের গাড়ির মতো অন্য একটি গাড়িতে ভুলবশত বোমা মারলে গাড়ির ভেতরে একজন ইংরেজ মহিলা ও তার মেয়ে মারা যান। এ ঘটনার পর ক্ষুদিরাম ওয়ানি রেলস্টেশনে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। তিনি বোমা নিক্ষেপের সমস্ত দায়িত্ব নিজের উপর নিয়ে নেন।

কিন্তু অপর কোনো সহযোগীর পরিচয় দিতে বা কোনো গোপন তথ্য প্রকাশ করতে রাজি হননি। এতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী মুজফ্ফরপুর কারাগারে ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ফাঁসিতে তার মৃত্যৃ হয়।

শেষ কথা হিসেবে যা বলেছিলেন ফাঁসির মঞ্চে-

স্বাধীনতার স্বপ্নে তিনি মৃত্যুভয়কেও বশ করেছিলেন। এমনকি, ফাঁসির মঞ্চে তার শেষ কথা চমকে দিয়েছিল উপস্থিত সকলকে। ১০ আগস্ট আইনজীবী সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তীকে ক্ষুদিরাম বলেছিলেন,‘রাজপুত নারীরা যেমন নির্ভয়ে আগুনে ঝাঁপ দিয়া জওহরব্রত পালন করিত, আমিও তেমন নির্ভয়ে দেশের জন্য প্রাণ দিব। আগামীকাল আমি ফাঁসির আগে চতুর্ভুজার প্রসাদ খাইয়া বধ্যভূমিতে যাইতে চাই।’

তবে ফাঁসির মঞ্চে এসেও যে প্রশান্তি ছিল তার মনে, তা সবচেয়ে বিস্ময়কর। ১৯০৮ সালের ১১ অগাস্ট জেলের ভিতরে গড়া হয়েছিল ১৫ ফুট উঁচু এক ফাঁসির মঞ্চ।

দুই দিকে ছিল দুটি খুঁটি। তার উপর একটি মোটা লোহার রড ছিল আড়াআড়িভাবে লাগানো। সেই রডের মাঝখানে মোটা একগাছি দড়ি বাঁধা ছিল। তার শেষ প্রান্তে ছিল মরণ-ফাঁস।

ক্ষুদিরামকে সেই মঞ্চে তাকে নিয়ে এসেছিলেন ব্রিটিশ সরকারের চার পুলিশ। ক্ষুদিরাম ছিলেন তাদের সামনে। ফাঁসির আগে উপস্থিত আইনজীবীদের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলেছিলেন তিনি।

তারপর পিছমোড়া করে বাঁধা হয় দুইহাত। গলায় ফাঁসির দড়ি পরানো মাত্র জল্লাদকে শহীদ শুদিরাম প্রশ্ন করেছিলেন ‘ফাঁসির দড়িতে মোম দেওয়া হয় কেন?’এটাই ছিল বীর শহিদের জীবনের শেষ কথা।

জল্লাদ বিস্ময়ে কিছু বলতে পারেননি। ফাঁসির আগে কী করে কারোর মনে এই প্রশ্ন আসতে পারে? এ সময় হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন ব্রিটিশ জেলার থেকে উপস্থিত সবাই।

ক্ষুদিরাম বসুকে ফাঁসি দেওয়া হয় মুজফফপুর সংশোধনাগারে। বর্তমানে সেই কারাগারের নাম বদলে বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর নামেই নামকরণ করা হয়েছে।

জেলে থাকা অবস্থায় গ্যারিবল্ডি ও রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়তে চেয়েছিলেন। অবশ্য সে ইচ্ছা আর পূরণ হয়নি। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই দেশের জন্য মৃত্যুবরণ করেছিলেন তিনি। আর শিখিয়ে গিয়েছিলেন দেশকে কিভাবে ভালোবাসতে হয়। কিভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হয়।

তার জন্মই ছিল বিপ্লবের উদাহরণ হয়ে বেঁচে থাকতে। হয়ত তাই আজও স্বাধীনচেতারা তাকে স্মরণ করে বলে, ‘শুভ জন্মদিন বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু’।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
topউপরে