৪৪ বছর ধরে অসহায় মানুষের চক্ষুসেবা দিচ্ছে ‘তাহেরপুর রিক্রিয়েশন ক্লাব’

প্রকাশিত: মে ৩০, ২০২৩; সময়: ১০:৪০ অপরাহ্ণ |
৪৪ বছর ধরে অসহায় মানুষের চক্ষুসেবা দিচ্ছে ‘তাহেরপুর রিক্রিয়েশন ক্লাব’

নিজস্ব প্রতিবেদক : গীতা রানির (৬৪) স্বামী সুকেশ হালদার মারা গেছেন সাত বছর আগে। সুকেশ মাছ ধরে বিক্রি করে সংসার চালাতেন। তিনি মারা যাওয়ার পর অসহায় হয়ে পড়েন গীতা। তাঁর চোখের সমস্যা দেখা দেয়। স্পষ্ট কিছু দেখতে পাচ্ছিলেন না। চিকিৎসা করানোর ইচ্ছা থাকলেও টাকার অভাবে হয়ে উঠছিল না।

তিনবেলা ঠিকমতো খেতেই পান না, চোখের চিকিৎসা করাবেন কীভাবে? প্রায় অন্ধ হতে বসেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ২০১৭ সালে ‘তাহেরপুর রিক্রিয়েশন ক্লাব’-এর সহযোগিতায় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চোখের আলো ফিরে পেয়েছেন এ বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষটি।

শুধু গীতা রানি নন, তাঁর মতো অসহায় আরও চার হাজার অসহায় মানুষ চোখে অস্ত্রোপচার-সুবিধা পেয়েছেন বিনা মূল্যে। এ ছাড়া ক্লাবটির সহযোগিতায় চোখের বিভিন্ন চিকিৎসা নিয়েছেন আট হাজার মানুষ। এভাবে ৪৪ বছর ধরে গরিব ও দুস্থ মানুষকে বিনা মূল্যে চক্ষু চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে রাজশাহীর বাগমারার তাহেরপুর রিক্রিয়েশন ক্লাব।

ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক মাহাবুবুর রহমান বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বিনা মূল্যে চোখের রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে ১৯৭৯ সাল থেকে। ওই বছর রাজশাহী শহরের ‘রাজশাহী লায়ন্স ক্লাব’ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম শুরু করে সংগঠনটি। সেই থেকে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় বিনা মূল্যে চক্ষুশিবিরের। তাঁরা ৩৭তম চক্ষুশিবির সম্পন্ন করেছেন।

তিনি বলেন, প্রতিটি শিবিরে ১০০-১২০ জন রোগীর ছানি অপারেশনসহ চোখের জটিল কিছু অস্ত্রোপচার করা হয়। এর দ্বিগুণ পরিমাণ রোগীর চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হয়। তবে এ বছর এর সংখ্যা আরও বেশি। এবারই প্রথম নেত্রনালির অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় চার হাজার রোগীর অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রমও পরিচালনা করেছে। অর্থসংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন কারণে সাতবার চক্ষুশিবিরের আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ গত ২৭ মে আয়োজন করা হয়েছিল বড় পরিসরে বিনা মূল্যে চক্ষুশিবিরের।

বাগমারা উপজেলার তাহেরপুর বাজারের প্রবেশমুখে বারনই নদ ঘেঁষে গড়ে উঠেছে ‘তাহেরপুর রিক্রিয়েশন ক্লাব’-এর কার্যালয়। সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ১৯৮১ সালের ৩১ মার্চ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে নিবন্ধন লাভ করে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিবছর বিনা মূল্যে এলাকার গরিব, দুস্থ ও অসহায় রোগীদের জন্য চক্ষুশিবিরের আয়োজন করে থাকে। রোগীদের শ্রেণিবিভাগ করে প্রাথমিক চিকিৎসা, ব্যবস্থাপত্র, ওষুধ ও চশমা সরবরাহ করা হয়। এসবের জন্য রোগীদের কোনো টাকা ব্যয় করতে হয় না। ক্লাবটির পক্ষ থেকে সবকিছু বহন করা হয়।

তাহেরপুর পৌরসভার মেয়র আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে মানবসেবা করে আসছে। চক্ষু রোগীদের দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে ও ঠিক রাখতে নিয়মিত বিনা মূল্যে চক্ষুশিবিরের আয়োজন করে আসছে, যা প্রশংসনীয়। তিনি ১৫ বছর ধরে নিয়মিত এই প্রতিষ্ঠানে আর্থিক সহযোগিতা করে আসছেন। এ বছর ৩০০ জনের চোখের ছানি ও ১০০ জনের নেত্রনালির অস্ত্রোপচারের ব্যয় তিনি বহন করেছেন। ক্লাবের সদস্য ছাড়াও স্থানীয় বিত্তশালীরা নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে এই সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন।

তাহেরপুর রিক্রিয়েশন ক্লাবের সদস্য ও স্থানীয় ব্যবসায়ী আবু বাক্কার মৃধা প্রথম আলোকে বলেন, তিন প্রজন্ম ধরে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর পরিবার জড়িত। জনসেবার জন্যই এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি জড়িত। তাঁর পূর্বপুরুষেরা জমি কিনে ক্লাবের নামে নিবন্ধন করে দিয়ে সেখানে ভবন নির্মাণ করেছেন।

প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী বলে জানিয়েছেন ক্লাবের সভাপতি হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও এখানে এসে সবাই এক কাতারে। ক্লাব পরিচালনা পর্ষদের সব দলের নেতা-সমর্থকেরা আছেন। তাঁরা মূলত একটি প্রসিদ্ধ চক্ষু হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

তবে কয়েক বছর ধরে সিরাজগঞ্জের প্রফেসর এম এ মতিন মেমোরিয়াল বি এন এস বি বেজ চক্ষু হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। চোখে লেন্স লাগাতে আড়াই হাজার টাকা এবং নেত্রনালির অস্ত্রোপচারে প্রায় ১০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এ জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, তা বহন করে ক্লাব।

১৯৮১ সালে নিবন্ধিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, এ রকম কাজ মানবিক কাজ প্রশংসার দাবিদার। প্রতিষ্ঠানটির কোনো ধরনের সহযোগিতা দরকার হলে তাঁর দপ্তর থেকে করা হবে। সূত্র- প্রথম আলো

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
topউপরে