দ্রব্যমূল্যে বিব্রত আওয়ামী লীগ

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৩; সময়: ১:৩৫ অপরাহ্ণ |
দ্রব্যমূল্যে বিব্রত আওয়ামী লীগ

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। এমন অবস্থায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। নির্বাচনের আগে বিষয়টি নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে রয়েছে ক্ষমতাশীন দল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, ওই পরিস্থিতিতে এখনই নাগাম টানা না গেলে এতে আগামী নির্বাচনে প্রভাব পরবে।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও বিভিন্ন ফোরামে এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তারা দ্রুত এ বিষয়ে সরকারকে ব্যবস্থা নিতেও আহ্বান জানাচ্ছেন। আর সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টির জন্য গত কয়েক মাসে ধারাবাহিকভাবে ইউক্রেন ও রাশিয়া যুদ্ধকে এক চেটিয়েভাবে দায়ী করা হয়েছে। তবে সম্প্রতি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গত শনিবার ঢাকা এভিলেটেড এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধনে আয়োজিত সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি ও চলমান অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ইঙ্গিত করে একে ‘সাময়িক সমস্যা’ বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আজকে একটা সাময়িক সমস্যা দেখা দিয়েছে। আমি আগেই বলেছি, এই ইউক্রেন যুদ্ধ আর রাশিয়ার এই ঘটনায় স্যাংশন, কাউন্টার স্যাংশনের জন্য আমাদের উপর এই ধাক্কাটা এসেছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, উদ্বেগজনকভাবে দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতিতে টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ পরিচালিত সরকার দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন ও অর্জন সত্ত্বেও দ্বাদশ সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা সাধারণ মানুষের সামনে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের এখন আওয়ামী লীগ এটাকে নির্বাচনের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি দেশের প্রতিটি মহলে সমালোচিত হচ্ছে। এমনকি আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ভাতৃপ্রতীম নেতাকর্মীরাও বিষয়টি নিয়ে দলীয় ফোরামে ও দলটির নেতাদের এ বিষয়ে জানাচ্ছেন। সরকারের এই বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও আওয়ামী লীগের নেতারা নির্বাচনের আগে বিষয়টি প্রধান সংকট বলে আখ্যায়িত করছেন।

সূত্রমতে, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সরকারের সব অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন দলের অনেক নেতা। তারা মনে করেন, শক্তিশালী সিন্ডিকেট, মধ্যস্বত্বভোগী ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের অসততাই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ। আওয়ামী লীগ নেতারা এত্ত মনে করেন, কোভিড-১৯ মহামারী থেকে দেশে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা শুরু হয়েছে এবং এরপর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ সারা বিশ্বে পণ্যমূল্যের অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের লোকেরা সবচেয়ে বেশি ভুগছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে কোভিড-১৯ মহামারীর পরে সাধারণ মানুষ আরো বেশি করে ওই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।

ফলে জনগণের অসন্তোষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের ওপর গিয়ে পড়েছে। এ অবস্থা সরকারের নীতিনির্ধারক ও আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নেতাদের বিরুদ্ধে দলের তৃণমূল পর্যায়কেও উত্তেজিত করে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় সরকার ও সংসদীয় উভয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরা বিপাকে পড়েছেন। কারণ তাদের নিয়মিত জনগণের সঙ্গে দেখা করতে হয় এবং আগামী সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে নিয়মিত গণসমাবেশে অংশ নিচ্ছেন।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন এলাকার কয়েকজন জনপ্রতিনিধি বলেন, আমাদের ভোট দেওয়ায় জনগণের দুর্ভোগ-অভিযোগ নিয়মিত দেখতে ও শুনতে হচ্ছে। এখন মানুষের সাধারণ অভিযোগ হচ্ছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং তারা বিষয়টি নিয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

জনপ্রতিনিধিরা আরও বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন ও অর্জনে জনগণ খুবই খুশি। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর তাদের আস্থা রয়েছে এবং জনগণ আশা করছে যত দ্রুত সম্ভব নিত্যপণ্যের দাম কমিয়ে বাজার স্বাভাবিক হবে।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় মূল্যবৃদ্ধিতে মানুষ সত্যিই হিমশিত খাচ্ছে এবং বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশে উৎপাদিত ও উৎপাদিত পণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও তাদের সিন্ডিকেট। তারা তাদের ইচ্ছামতো পণ্যের দাম বাড়ায় এবং কমায়। তবে, কিছু পণ্য রয়েছে যা আমাদের বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। সেক্ষেত্রে, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে নিষেধাজ্ঞা এবং অ্যান্টি-অ্যান্টি-অ্যাকশন এবং রপ্তানিকারক দেশগুলি দ্বারা আরোপিত ট্যাক্সের মতো অনেক কারণ রয়েছে আমদানি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির পেছনে।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, সরকার যদি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারে তাহলে এ সমস্যা থেকে সহজে মুক্তি মিলবে না। অবশ্যই এর জন্য সরকারকে যথেষ্ট কঠোর হতে হবে। সরকার যখন কঠোর পদক্ষেপ শুরু করবে এবং সেই সব অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে চেষ্টা করবেন তখন জনগণও সরকারের পক্ষে থাকবে। যার প্রভাব আগামী নির্বাচনে পরতে বাধ্য। প্রয়োজনে সামাজিক সচেতনতা ও প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য ঠেকাতে হবে বলেও আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করছেন।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, সরকার এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে, সরকার তো আমাদের দলেরই সরকার। কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেট করে এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে। এ জন্য সরকারকে আরো কঠোর হওয়া উচিত। আসলেই মধ্যবিত্তরা দ্রব্যমূল্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় হিমশিম খাচ্ছে বিষয়টি সরকারের দেখা উচিত, চিন্তা করা উচিত। আগামী নির্বাচনে বিষয়টি প্রভাব পরবে কীনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবশ্যই এটা নিয়ে তো আশঙ্কা করাই যায়। একটা আঘাত তো আসতে পারে। তাই আমি সরকারকে এ বিষয়ে দ্রুত বিষয়টির নিরশনের আহ্বান জানাই।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এক নেতা জানান, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনা আছে। তিনি জানান, নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন দেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর তবে নির্বাচনে আগে জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে সেটা অবশ্যই আওয়ামী লীগের জন্য মাথা ব্যাথার কারণ হতে পারে। কারণ নির্বাচনে মানুষ যখন ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন তখন এ বিষয়টি সরকারি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যাবে। তাই সরকারের উচিত দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া।

এ বিষয়ে গত রোববার সচিবালয়ে সরকারের তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদকে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা। এর জবাবে তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্য সারা পৃথিবীতে বৃদ্ধি পেয়েছে। তুরস্কের মুদ্রাস্থিতি ৮২ শতাংশে উঠেছিল, পাকিস্তানে ৩২ শতাংশের উপরে গিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১০ শতাংশ, ইউরোপীয় ইউনিয়নে সদস্যগুলো কোন দেশে ১০ থেকে ২০ শতাংশ। জ্বালানীর ক্ষেত্রে সেগুলো আরো বেশি। আমাদের দেশে মুদ্রাস্থিতি ৮ থেকে ৯ শতাংশ। কোন কোন দেশের তুলনায় অনেক কম হচ্ছে।

তবে এতে যে জনগণের অসুবিধা হচ্ছে এ বিষয়ে আমরা ওয়াকিবহাল। আমরা চেষ্টা করছি। যাতে জনগণের অসুবিধা না হয়। সে জন্য নানা ধরনের কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। টিসিবির মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে পণ্য বিতরণ করা হচ্ছে। ১ কোটি পরিবারকে কার্ড দেয়া হয়েছে। আরও ৫০ লাখ মানুষকে ৩০ টাকা দামে খাদ্য সামগ্রী দেয়া হচ্ছে। বিনামূল্যেও চাল দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আছে বাংলাদেশে কোন কিছুতে একটা অজুহাত পেলেই তারা দাম বাড়ানোর চেষ্টা করে। এ বিরুদ্ধে আসলে আমাদের একটা সামাজিক প্রতিরোধ দরকার।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
topউপরে