কম দামে ধান কিনতে জোটবদ্ধ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট

প্রকাশিত: জুন ১৩, ২০২৪; সময়: ৭:২৭ অপরাহ্ণ |
কম দামে ধান কিনতে জোটবদ্ধ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট

নিজস্ব প্রতিবেদক, জয়পুরহাট : জয়পুরহাটে ব্যবসায়ীরা বেশী লাভের আশায় জোটবদ্ধ হয়ে ধান কিনছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কম মূল্যে ধান ক্রয় করে মিল-চাতাল মালিকরা সেই ধান থেকে চাল তৈরী করে সরকার নিদ্ধারিত রেটে খাদ্যগুদামে সরবরাহ করে মোটা অংকের লাভ করবেন বলে শংঙ্খা কৃষকদের। আবার স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বাহির থেকে আশা মহাজনদের হাটে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন ভিন্ন কথা। ভেজা ধান বলে কম দামে ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে। রোদ ওঠলেই দাম বেড়ে যাবে। আর বাজার সবার জন্য উম্মোক্ত। যে কেউ বাজার থেকে ধান ক্রয় করতে পারেন।

মিল-চাতাল মালিক, ফরিয়া ও মহাজনরা বাজারে বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে কৃষকদের উৎপাদিত ধান অনেক কম মূল্যে ক্রয় করছেন। মাড়াইয়ের পর চাষীরা বাজারে ধান নিয়ে এসে ব্যবসায়ীদের ফাঁদে পা দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে অনেকেই বিক্রি করতে না পেড়ে ফেরত নিয়ে যাচ্ছেন। ধান বিক্রি করে চাষীরা লোকসান গুণলেও কৌশলে লাভোবান হচ্ছেন এলাকার মিল-চাতাল মালিক, ফরিয়া ও মহাজনরা। কম দামে ধান কিনে অল্প দিনেই বেশী লাভ করছেন তারা।

গতকাল জেলার বৃহত ধানের বাজার পাঁচশিরা, পুনট ও ইটাখোলা হাটে কৃষকদের জিম্মি করে ব্যবসায়ীরা মোটা জাতের মামুন ও স্বর্ণা-৫ ধান ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা এবং চিকন কাটারি জাতের ১০৫০ থেকে ১১০০ টাকা (৪০ কেজির) মণ দরে ক্রয় করেছেন। এতে প্রতি কেজি মোটা ধান ১৭-১৮ টাকা এবং চিকন ধান ২৬-২৭ টাকা দরে বিক্রি করছেন কৃষকরা। অথচ প্রতি কেজি ধানের সরকার নিদ্ধারিত মূল্য ৩২ টাকা আর চালের মূল্য ৪৫ টাকা ঘোষনা করা হয়েছে। ৪০ কেজি ধান থেকে চাল হয় ৩০ কেজি। সে অনুপাতে ৩০ কেজি চালের সরকারি মূল্য আসে ১৩৫০ টাকা। চাতাল ব্যবসায়ীরা কৃষকদের নিকট থেকে ধান ক্রয়ের পর চাল বিক্রয় করে লাভ করবেন ৬৫০ টাকা। কৃষকদের অভিযোগ, মিল-চাতাল মালিকরা জোটবদ্ধ হয়ে বেশী লাভের আশায় কম দামে ধান কেনার জন্য বাজারে মাঝে-মধ্যে ধান কেনা বন্ধ রাখেন। যখন বাজারে ধানের আমদানী বেশী হয়, তখন ব্যবসায়ীরা ক্রয় করার চাহিদা কমে দেয়। কম দামে বেশী পরিমান ধান ক্রয়ের জন্য ব্যবসায়ীরা এসব নাটক করেন। শ্রমিক বিদায়সহ সেচের টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হয়ে কম দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে ধান। ভ‚ক্তভোগী কৃষকরা উৎপাদিত ধানের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে দিনের পর দিন লোকশান গুণলেও অল্প সময়ে মোটা অংকের লাভ গুণছেন মধ্যে সত্ত¡ভোগী ব্যবসায়ীরা।

জেলা খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জয়পুরহাটের পাঁচটি উপজেলার খাদ্যগুদামগুলোতে এবার সরকার নিদ্ধারিত ৩২ টাকা কেজি দরে ৬ হাজার ৬৫৭ মে.টন ধান এবং সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ মিল-চাতাল মালিকদের নিকট থেকে ২১ হাজার ৫৯৭ মে.টন চাল ক্রয় করবেন। স্থানীয় মিলারদের নামে ইতমধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং ক্রয় শুরু হয়েছে। বরাদ্দ পেয়ে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার থেকে ব্যবসায়ীরা সুযোগ বুঝে যে যার মত করে কৌশলে ধান ক্রয় করছেন। আবওহাওয়ার কারনে তারা এমন কৌশল চাষীদের উপর প্রয়োগ করছেন।

ক্ষেতলালের মুন্দাইল গ্রামের কৃষক শাহিন বলেন,‘ধান বিক্রি করতে এসে যে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, লাভতো দুরের কথা, মোটা অংকের লোকশান গুণতে হচ্ছে আমাদের। যাও একটু দাম বাড়তো, আবওহাওয়ার সাথে ব্যবসায়ীদের কারণেই সেটা সম্ভব হচ্ছেনা। এবার বিগা প্রতি উৎপাদন খরচ হয়েছে ১৬ হাজার টাকা। ৮ বিঘা জমিতে ধান পেয়েছি গড়ে ২০ মণ করে ১৬০ মণ, হিসাব করে বিগা প্রতি ৪ হাজার করে মোট ৩২ হাজার টাকা লোকশান হয়েছে।

জোটবদ্ধ হয়ে ধান ক্রয়ের বিষয় অস্বীকার করেছেন পাঁচশিরা বাজারের মা চাউল-কলের স্বত্তাধীকার মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন,‘আবওহাওয়াজনিত কারনে ধান ভেজা হওয়ায় গত সপ্তাহের চেয়ে বর্তমানে মণে এক থেকে দেড়শ টাকা কমে গেছে। রোদ ওঠলেই ধানের দাম বেড়ে যাবে। ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা মিথ্যা, বাজার সবার জন্য উম্মোক্ত। যে কেউ এসে ধান ক্রয় করতে পারবে। কৃষকরা অনবরত ব্যবসায়ীদের দোষ দিয়ে থাকেন। এটা নতুন কিছু নয়।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কামাল হোসেন বলেন,‘এ জেলার কৃষকরা চিকন জাতের ধান চাষ করে। সরকারের নিদ্ধারিত মূল্যের চেয়ে বাজারে দাম বেশি হওয়ায় তারা গুদামে ধান দিতে চায় না। ফলে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। তবে আশা করছি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এবার শতভাগ চাল সংগ্রহ হবে।

জেলা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা রতন কুমার রায় বলেন,‘ধানের দাম নিয়ে বিভিন্ন কথাই শুনতে পাচ্ছি। সরকার ধান-চালের যে দর বেঁধে দিয়েছেন, সে অনুপাতে বিক্রি করতে পারলে কৃষকরা লাভবান হবেন। ধানের বাজার এতো কম হওয়ার কথা নয়। ধানের বাজারমূল্য কম হওয়ার পেছনে কোন রহস্য আছে কিনা তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
topউপরে