চরাঞ্চলে রাসেল ভাইপার আতঙ্ক, ভয়ে ক্ষেতে যাচ্ছেনা শ্রমিকরা

প্রকাশিত: জুন ২৪, ২০২৪; সময়: ১:৩৮ অপরাহ্ণ |
চরাঞ্চলে রাসেল ভাইপার আতঙ্ক, ভয়ে ক্ষেতে যাচ্ছেনা শ্রমিকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঈশ্বরদী : পাবনার ঈশ্বরদীতে রাসেলস ভাইপার সাপের উপদ্রবে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা। একের পর এক বিষাক্ত এ সাপের দেখা মিলছে উপজেলার চরাঞ্চলের পদ্মা নদী তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায়। এতে ভয়ে ফসলি জমিতে যাচ্ছে না কৃষকেরা।

পদ্মা নদী তীরবর্তী জেগে উঠা চরাঞ্চলে স্থানীয়রা বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ফসলের আবাদ করে থাকে। তবে এ সাপ সম্পর্কে তেমন কিছু না জানায় স্থানীয়রা আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। পরিবেশ বাদী সংগঠনগুলোর মতে, সামাজিকভাবে গণসচেতনতা তৈরির মাধ্যমে এ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

জানা যায়, উপজেলার পদ্মা নদী তীরবর্তী চররুপপুর, নলগাড়ী, যুক্তিতলা, গাইড ব্যাংক পাড়া, গাঁওগোয়াইল, কদিমপাড়া, চরগড়গড়ি, দীঘা, লক্ষীকুন্ডা, বরমপুর, পাকুড়িয়া, কালামপুর পূর্ব পাড়া, চরকুড়ুলিয়াসহ সাঁড়া ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকার বিস্তীর্ণ জমিতে স্থানীয়রা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভূট্টা, বাদাম, তিল, পেঁয়াজ, আমন এবং আউশসহ মৌসুমি ফসলের আবাদ করে থাকেন। অন্যদিকে চরাঞ্চলের মানুষের জীবিকার আরও একটি মাধ্যম হলো গবাদিপশু পালন। চরের এই সব গবাদিপশু পালনের জন্য জমিতে ঘাসের চাষও করা হয়। অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল হওয়াতে চরাঞ্চলের বেশিরভাগ বসতিস্থল কাঁচা এবং ওই ঘরেই বসবাস করে থাকেন চরবাসী।

রাসেল ভাইপার সাপের কামড়ে গত ৩১ মে উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের দীঘা গ্রামের নিজের কলা খেতে কাজ করার সময় হাফিজুর রহমান (৪৫) নামের এক কৃষকের মৃত্যু হয় ।

কিছু দিন পর চরাঞ্চলের কালামপুর পূর্ব পাড়া গ্রামে ফসলের ক্ষেতে কাজ করতে গিয়ে সাপের কামড়ে এক রাজা মোল্লা নামে এক কৃষক মারা যান, অনেকের ধারণা রাসেলস ভাইপার সাপের কামড়ে তাঁর মৃত্যু হয়। এছাড়া এই চন্দ্রবোড়া (রাসেলস ভাইপার) সাপের কামড়ে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে বলেও ধারণা চরাঞ্চলবাসীর। যার ফলশ্রুতিতে পদ্মা নদীর তীরবর্তী ও চরাঞ্চলের বসবাস করা মানুষ রয়েছেন সাপ আতঙ্কে।

পদ্মা নদী তীরবর্তী চরগড়গড়ি গ্রামের নজরুল ইসলাম নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, আমি গত কয়েক দিন আগে জমি থেকে তিল কেটে রেখে আসি এবং পরে বিকেল বেলায় তিল তুলতে গিয়ে দেখি বেশ কয়েকটি চন্দ্রবোড়া (রাসেলস ভাইপার) সাপ। পরে এই সাপ দেখে ভয়ে জমি থেকে তিল না তুলেই চলে আসি

গাঁওগোয়াইল গ্রামের এক কৃষক বলেন, গত কয়েকদিন আগে ধান কেটে আঁটি বেঁধে রাখি এবং মিনিট দশেক পর দেখি আটিকে পেঁচিয়ে ধরে আছে এই চন্দ্রবোড়া (রাসেলস ভাইপার) সাপ। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় ওই চন্দ্রগোড়া সাপটিকে মেরে ফেলি কিন্তু চরাঞ্চলে যে পরিমাণে এই বিষধর সাপ দেখা যাচ্ছে, একটি সময় চরাঞ্চলে বসবাস করাটা দুর্বিষহ হয়ে পড়বে।

অন্য লালপুর উপজেলা থেকে আসা মৌসুমি শ্রমিক লাবু বেপারী বলেন, আমরা এই মৌসুমে ধানের কাজ করার জন্য এই অঞ্চলেই আসি প্রতি বছর। তবে পদ্মা তীরবর্তী চরাঞ্চলে গত কয়েক বছর কাজ করেছি কিন্তু এই সাপের দেখা পাইনি। চলতি মৌসুমে তিন/চার জন গৃহস্থের বাড়িতে কাজ করেছি কিন্তু অধিকাংশ জমিতেই এই চন্দ্রবোড়া (রাসেলস ভাইপার) সাপের দেখা পেয়েছি এবং পাঁচটির মতো সাপ মেরেছি বলেও মন্তব্য করেছে এই শ্রমিক।

লক্ষীকুন্ডা পরিষদের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান শরীফ বলেন, এই ইউনিয়নটির চার পাশেই উত্তাল পদ্মা নদী। এ নদীর জেগে উঠা চরেই মানুষ মৌসুমি ফসলের আবাদ করে থাকেন। চরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম মাধ্যম হলো গবাদিপশু পালন ও কৃষি জমি চাষাবাদ। গত মার্চ মাসে আমার এই এলাকার এক কৃষককে চন্দ্রবোড়া (রাসেলস ভাইপার) সাপে দংশন করে পরবর্তীতে তার মৃত্যুও হয়।

পাবনার বন্য প্রাণী সংরক্ষণ বিষয়ক সংগঠন নেচার এন্ড ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন কমিউনিটির সভাপতি এহসান আলী বিশ্বাস বলেন, উপজেলার পদ্মা নদী তীরবর্তী চরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি স্থানে চন্দ্রবোড়া (রাসেলস ভাইপার) সাপ দেখা যাচ্ছে, এরি মধ্যে বেশ কয়েক জনকে কামড় দিয়েছে এবং কয়েক জন মারাও গেছেন। পৃথিবীর বিষধর সাপের মধ্যে এটি (রাসেল ভাইপার) অন্যতম। সাপটি খাবার হচ্ছে মূলত ইঁদুর, ব্যঙ্গ, টিকটিকি। যার কারণে ধানক্ষেত, ভুট্টাক্ষেতে এই সাপের দেখা মিলছে বেশি। এই বিষধর সাপ থেকে মানুষকে রক্ষায় প্রতিটি ইউনিয়নে গণসচেতনতা তৈরি করা জরুরি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মিতা সরকার বলেন, চরাঞ্চলে যে সব ফসলি জমি রয়েছে, প্রতিটি জমি থেকে ফসল তোলার সময় অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এবং রাসেলস ভাইপার সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুবীর কুমার দাস বলেন, সম্প্রতি পদ্মা তীরবর্তী চরাঞ্চলে রাসেল ভাইপার নামের বিষধর সাপের উপদ্রব বেড়ে গেছে। স্থানীয়ভাবে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে আমরা কাজ শুরু করেছি। অপর দিকে উপজেলা পরিষদ থেকে প্রথম অবস্থায় চরাঞ্চলে কৃষকদের বিশেষ জুতার (গামবুট) ব্যবস্থা করা হবে।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
topউপরে