তিস্তা-গঙ্গা নিয়ে মোদীকে হুঁশিয়ারি মমতার

প্রকাশিত: জুন ২৪, ২০২৪; সময়: ১১:৪০ অপরাহ্ণ |
তিস্তা-গঙ্গা নিয়ে মোদীকে হুঁশিয়ারি মমতার

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : বাংলাদেশকে তিস্তা ও গঙ্গা নদীর পানি দেওয়ার বিষয়ে বিরোধিতা করেছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

তার অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গকে না জানিয়েই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশকে পানি দিতে চাইছে। এমন পরিস্থিতিতে মমতার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কেন্দ্র যদি একতরফাভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তার প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই ভারতজুড়ে বড় আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

আনন্দবাজার পত্রিকা জানিয়েছে, সোমবার রাজ্য সরকারের সচিবালয় ‘নবান্নে’ এক বৈঠকে মমতা বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গের পানি বিক্রি করে দিচ্ছে। সিকিম যখন তিস্তা নদীর উপর ১৪টা হাইড্রো পাওয়ার (জলবিদ্যুৎ) করেছে, তখন তারা (কেন্দ্র সরকার) চোখে দেখেনি। আর এখন বলছে সব পানি দিয়ে দাও। দিতে তো আপত্তি নেই, কিন্তু আমার থাকলে তো দেবো। আমি বন্ধুত্ব করতে চাই, কিন্তু রাজ্যকে বিক্রি করে দেওয়ার স্বার্থে নয়।

মমতা বলেন, পানির আরেক নাম জীবন। কেন্দ্রীয় সরকার জানে না যে উত্তরবঙ্গের একাংশের মানুষ আগামী দিনে খাবার পানি পাবে না। তিস্তায় পানি নেই। ভাবছে গায়ের জোরে উত্তরবঙ্গে জিতেছে বলে, সেখানকার মানুষকে বঞ্চিত করবে।
এসময় মুখ্যমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, কেন্দ্র যদি আমাদের কথা না শোনে ও একতরফাভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে বাংলা জুড়ে আন্দোলন চলবে, দেশজুড়ে আন্দোলন চলবে।

শনিবার দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠকের পরেই আপত্তি তোলা হয়েছিলো তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে। সোমবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি লিখে ফারাক্কা চুক্তি নবায়ন এবং তিস্তার পানি ভাগাভাগি নিয়ে দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

মমতা লিখেছেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অংশগ্রহণ ছাড়া তিস্তা এবং ফারাক্কার পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো রকম চুক্তিতে তার তীব্র আপত্তি রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্বার্থ নিয়ে কোনো আপস তিনি করবেন না।

চিঠিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী মমতা লিখেছেন, গঙ্গা এবং তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে হয়তো আপনার কিছু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু রাজ্য সরকারের কোনো মতামত না নিয়ে এমন একতরফা আলোচনা কাঙ্ক্ষিত বা গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলাদেশের সরকার এবং জনগণের সঙ্গে যে তিনি সুসম্পর্ক রাখতে চান, সেই বার্তা দিয়ে মমতা জানিয়েছেন, ছিটমহল বিনিময়, রেল ও বাস যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিবিড় হয়েছে। কিন্তু পানি অত্যন্ত মূল্যবান। প্রাণধারণের রসদ নিয়ে কোনো সমঝোতা করতে আমরা প্রস্তুত নই। পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে পানিবণ্টনের বিষয়টি ‘অত্যন্ত স্পর্শকাতর’ বলেও উল্লেখ করেন মমতা।

গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে ১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৬ সালে। শনিবার নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। সেখানে ফারাক্কা চুক্তির নবায়ন জন্য ‘যৌথ কারিগরি কমিটি’ তৈরি করা হয়েছে।

দুই প্রধানমন্ত্রী বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতি দেন। সেখানে নরেন্দ্র মোদী বলেন, গঙ্গা চুক্তির সম্প্রসারণে টেকনিক্যাল আলোচনার বিষয়ে একমত হয়েছি। তিস্তা নদীর পানি বন্টনের ব্যাপারে শিগগিরই একটি কারিগরি দল বাংলাদেশে যাবে।
১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ৩০ বছরের জন্য গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি হয়।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমীসাংসিত এই বিষয়টি নিয়ে একটি সুরাহায় আসে। দিল্লিতে ছিলো এইচডি দেবগৌড়ার যুক্তফ্রন্ট সরকার। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু সে সময় পানি বণ্টন চুক্তিতে সমর্থন করেন।

মোদীকে পাঠানো চিঠিতে মমতা লিখেছেন, পশ্চিমবঙ্গের জনজীবনে গঙ্গার পানির গুরুত্বের পাশাপাশি ফরাক্কা থেকে পাওয়া পানি কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও বড় ভরসা। ফারাক্কা ফিডার ক্যানালের মাধ্যমে অন্তত ৪০ হাজার কিউসেক জল পেলে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বজায় রাখা সম্ভব। তা না হলে গঙ্গায় পলি পড়ে কলকাতা বন্দর জাহাজ চলাচলের উপযোগী নাব্যতা হারাতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী মোদীকে পাঠানো চিঠিতে তিস্তার পানিবণ্টন প্রসঙ্গেরও উল্লেখ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। লিখেছেন, সিকিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে তিস্তার গুরুতর স্বাস্থ্যহানি হয়েছে। পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে।

মমতা চিঠিতে লেখেন, দেখে আশ্চর্য হচ্ছি, তিস্তার ভারতীয় অংশের স্বাস্থ্য ফেরাতে পানি শক্তি মন্ত্রণালয়ের কোনো উদ্যোগই নেই। সিকিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে তিস্তায় পানিপ্রবাহ কমেছে এবং তাতে উত্তরবঙ্গের কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের আগে দুই দেশের পানি সম্পদ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তার পানিবন্টন চুক্তির বিষয়ে দুইপক্ষ একমত হয়েছিলো।

মনমোহন সিংয়ের সফরেই বহু প্রতীক্ষিত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় তা আটকে যায়। নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি সরকার ভারতের ক্ষমতায় আসার পর তিস্তা চুক্তি নিয়ে আশার কথা শোনা গেলেও মমতার মত বদলায়নি।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
topউপরে