নাবিল গ্রুপের ঋণ জালিয়াতির ‘ভয়ঙ্কর চিত্র’

প্রকাশিত: জুলাই ৯, ২০২৪; সময়: ১:২১ অপরাহ্ণ |
নাবিল গ্রুপের ঋণ জালিয়াতির ‘ভয়ঙ্কর চিত্র’

নিজস্ব প্রতিবদেক : ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে নাবিল গ্রুপের ১১টিসহ বেশ কিছু কোম্পানির তথ্য জানতে চেয়ে ইসলামী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রোববার ওই চিঠি পাঠানোর বিষয়টি জানিয়ছেন দুদকের উপপরিচালক মো. ইয়াছির আরাফাত।

চিঠিতে নাবিল গ্রুপের ১১টি প্রতিষ্ঠানের ঋণের তথ্য চাওয়া হয়েছে। চিঠি প্রাপ্তির সাত কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য সরবরাহ করতে বলা হয়েছে দুই ব্যাংককে।

নাবিল গ্রুপের কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে- নাবিল নাবা ফুডস লিমিটেড, নাবিল কোল্ড স্টোরেজ, নাবিল ফিড মিলস লিমিটেড, নাবিল অটো রাইস মিল, নাবিল অটো ফ্লাওয়ার মিল, শিমুল এন্টারপ্রাইজ, নাবা এগ্রো ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, আনোয়ারা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, নাবা ফার্মা লিমিটেড, নাবিল গ্রীন ক্রপস লিমিটেড ও ইন্টারন্যাশনাল প্রোডাক্ট প্যালেস।

ইসলামী ব্যাংকের গুলশান করপোরেট শাখা, রাজশাহী ও নিউমার্কেট শাখা এবং পাবনা শাখার গ্রাহক নাবিল গ্রুপের এই কোম্পানিগুলোর তথ্য চাওয়া হয়েছে।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ইসলামী ব্যাংক থেকে নাম সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করছে জামায়াত-শিবির চক্র। ২০১৭ সালে নতুন পরিচালনা পর্ষদ আসার পরও তা বন্ধ হয়নি। তেমনি একটি প্রতিষ্ঠান রাজশাহীর নাবিল গ্রুপ। ব্যাংকের নথি বলছে, ব্যাংক ঋণের শর্ত ভঙ্গ করে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা তারা হাতিয়ে নিয়েছে ইসলামী ব্যাংক থেকে।

দুদক বলছে,

ঋণ জালিয়াতি ঘটনা অনুসন্ধানে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। দুদকের উপপরিচালক মো. ইয়াছির আরাফাতের নেতৃত্বে কমিটিতে রয়েছেন আরেক উপপরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও সহকারী পরিচালক রণজিৎ কুমার কর্মকার।

চিঠিতে বলা হয়, ‘পর্যাপ্ত নথিপত্র ও জামানত ছাড়াই কোম্পানিগুলোকে ঋণ দেওয়া হয়েছে’- এমন অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। নাবিল গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

২০২২ সালের ২৪ নভেম্বর দৈনিক প্রথম আলোতে ইসলামী ব্যাংকে ‘ভয়ংকর নভেম্বর’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘নাবিল গ্রুপের নামে’ ইসলামী ব্যাংক থেকে ২ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে একটি ‘অসাধু চক্র’। আর আটটি প্রতিষ্ঠানের নামে বিভিন্ন উপায়ে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা তুলে নেওয়ার খবর ছাপা হয় ওই প্রতিবেদনে।

ইসলামী ব্যাংক থেকে অসাধু চক্রের কোটি টাকা তুলে নেওয়ার ঘটনায় তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনরকে গত ওই বছরের ২৭ নভেম্বর চিঠি দেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ, আবদুল্লাহ সাদিক এবং গ্রাহক শাইখুল ইসলাম ইমরান ও যায়েদ বিন আমজাদ।

আইনজীবীদের চিঠিতে বলা হয়, “গত ২৪ নভেম্বর প্রথম আলো পত্রিকার অনুসন্ধানী রিপোর্টে উঠে এসেছে, ইসলামী ব্যাংক থেকে নভেম্বরে ২ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা অসাধু চক্র তুলে নিয়েছে। এই ধরনের সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনে আমরা সংক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন। তাই তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করার অনুরোধ করছি।”

এরপর ঋণ জালিয়াতির এসব তথ্য জানতে ২০২৩ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দেয় দুদক। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ওইসব প্রতিষ্ঠানসমূহে পরিদর্শন চলমান থাকায় কার্যক্রম শেষে প্রস্তুত করা প্রতিবেদন পাঠানো হবে। এর ছয় মাস পর ঋণ জালিয়াতির তথ্য জানতে ফের চিঠি দিল দুদক।

ঋণ জালিয়াতি

অফিসের পিওন থেকে শুরু করে বেশ কয়েকজন কর্মচারীর নামে কাগুজে প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ইসলামী ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে রাজশাহীর নাবিল গ্রুপ। এছাড়াও একটি দোকানের ম্যানেজারের নামেও তারা ঋণ নিয়েছে ৩৮০ কোটি টাকা।

অনুসন্ধনে জানা গেছে, রাজশাহীর একটি মোটরসাইকেল দোকানের সুলতান আহমেদ। তাকে সুলতান অ্যাসোসিয়েটসের মালিক দেখিয়ে সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংক থেকে ৩৮০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের কাগজপত্রে সুলতান আহমেদকে সুলতান অ্যাসোসিয়েটসের মালিক দেখানো হলেও বাস্তবের সুলতান মাত্র ২০ হাজার টাকায় চাকরি করেন। ৩৮০ কোটি টাকার ঋণ পাওয়া কথিত এই প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ের ঠিকানা হিসেবে দেখানো হয়েছে রাজশাহীর স্টেশন রোডে সদ্য নির্মিত এক ভবন।

ঋণ পাওয়া আরেকজন রোকনুজ্জামান মিঠু। ১২ হাজার টাকা বেতনে একটি প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী হিসেবে কাজ করছেন। ঋণ নিয়েছেন ৯৫০ কোটি টাকা।

রাজশাহীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হিসাবরক্ষকের কাজ করেন শাজাহান আলী। তার নামের করা প্রতিষ্ঠান এসএস স্ট্রেটলাইন ঋণ নিয়েছে ৯০০ কোটি টাকা। প্রায় হাজার কোটি টাকার মালিকের বাড়ি রাজশাহীর নওহাটা পৌরসভায়।

সামান্য বেতনে চাকুরি করা তিনজন ব্যক্তির সন্দেহজনক এমন ঋণের নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঋণ পেতে মিঠু আমানত হিসেবে জমা দিয়েছেন ৫০ কোটি টাকা, শাজাহান ১০০ কোটি টাকা এবং সুলতান দিয়েছে ৪০ কোটি টাকার সম্পদ।

জামান সিন্ডিকেটের মালিক রোকনুজ্জামান মিঠুকে ঋণ দেয়া হয়েছে পাবনা জেলা সদর শাখা থেকে। ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জামান সিন্ডিকেটের অফিস পাবনা জেলার হেমায়েতপুর উপজেলার ইসলামপুরে, যা ভাড়া নেয়ার পর কয়েকবার শুধু রাতের বেলা খোলা হয়েছে। আর মোটরসাইকেলের দোকানের ম্যানেজার সুলতান আহমেদের নামে ৩৮০ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে ইসলামী ব্যাংকের রাজশাহীর নিউমার্কেট ব্রাঞ্চ থেকে।

এর বাইরেও ৫০ কোটি টাকা ঋণ নেয়া এন এন্ড এন ট্রেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক নাবিল গ্রুপের কর্মচারী রায়হানুল ইসলাম। ঋণ প্রস্তাবে দেয়া প্রতিষ্ঠানের দেয়া ঠিকানায় নাবিল গ্রুপের আরও দুইটি অঙ্গ-প্রতিষ্ঠানের নামফলকও দেখা যায়।

এছাড়াও পুবালী ব্যাংকের রাজশাহীর করপোরেট শাখা থেকেও ৪০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে নাবিল গ্রুপ। সর্বশেষ গত জুন ফাইনালের আগে ৫০ কোটি টাকা ছাড় করিয়েছে বলে জানা গেছে।

নথি বলছে, শুধু নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানই নয়, এর বাইরেও ব্যাংক ঋণের শর্ত ভঙ্গ করে প্রায় আরও দুই হাজার ৯ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। ঋণ নেয়ার বড় শর্ত হলো প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট রেটিং, কর্পোরেট রেটিং, পাস্ট পারফর্মেন্স। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এগুলোর কিছুই নেয়া হয়নি।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
topউপরে