ঘাম ঝরাল কৃষক, লাভ তুলছে সিন্ডিকেট-প্রশাসন দেখছে নীরব দর্শক হয়ে

প্রকাশিত: নভেম্বর ৭, ২০২৫; সময়: ১২:৩১ pm | 
খবর > অর্থনীতি

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : কারসাজি করে মাত্র এক সপ্তাহে কেজিপ্রতি ৪০ টাকা বাড়িয়ে পেঁয়াজের দাম ১৪০ টাকায় ঠেলে দিয়েছে সিন্ডিকেট। মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ৭০ টাকা। পরিকল্পিতভাবে দাম বাড়িয়ে আমদানির অনুমতি নেওয়ার কৌশলে কৃষক ক্ষতির মুখে পড়ার শঙ্কা প্রকাশ করছেন। অন্যদিকে ভোক্তার প্লেটে আগুন ধরিয়ে উল্লাস করছে একদল মুনাফালোভী ব্যবসায়ী। আর এই নাটক দেখছে নীরব প্রশাসন।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিবছর এই সময়টাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে রেখে মুনাফার খেলায় মেতে ওঠে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। গত মৌসুমে কৃষকরা ন্যায্য দাম না পেয়ে সব পেঁয়াজ বিক্রি করে দিয়েছেন। ফলে এখন তাদের হাতে কোনো পেঁয়াজ নেই, যা মজুত রয়েছে অসাধু ব্যবসায়ীদের গুদামে। এই সুযোগে তারা সিন্ডিকেট করে বাজার থেকে পেঁয়াজ তুলে রেখে দাম বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরকারকে ভারত থেকে আমদানির অনুমতি দিতে চাপ দিচ্ছে।

পাবনার চাটমোহরের কৃষক বরকতউল্লাহ বলেন, ‘আমরা কষ্ট করে মাঠে পেঁয়াজের আবাদ করছি। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসবে। কিন্তু এখন যদি আমদানি করা পেঁয়াজ আসে, আমরা ক্ষতির মুখে পড়ব। উৎপাদন খরচই উঠবে না। সরকার যদি আমদানি বন্ধ না করে, তাহলে কৃষক টিকতে পারবে না।’

রাজধানীর কাওরান বাজার, নয়াবাজার, মালিবাগ কাঁচাবাজার ও রামপুরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ১২০-১৩০ টাকায়, যা ৭ দিন আগেও ছিল ৭০-৮০ টাকা। আর এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৬৫ টাকায়। পাড়া-মহল্লার মুদি দোকানগুলোতে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায়।

নয়াবাজারে নিত্যপণ্য কিনতে আসা ক্রেতা সোলাইমান শাওন বলেন, ‘প্রতি বছরই এই মাসে বিক্রেতারা দাম বাড়ায়। এবারও বাড়ানো হয়েছে। অথচ বাজারে পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি নেই। চাইলে ১০ কেজিও পাওয়া যাচ্ছে। তাহলে সরবরাহ সংকটের অজুহাতে দাম বাড়ানো হচ্ছে কেন? সরকারের কেউ যেন দেখার নেই।’

রাজধানীর বৃহত্তম পাইকারি আড়ত শ্যামবাজারে বৃহস্পতিবার পাল্লা পেঁয়াজ (৫ কেজি) বিক্রি হয়েছে ৫২৫-৫৫০ টাকায়, অর্থাৎ কেজিপ্রতি ১০৫-১১৫ টাকা। যা এক মাস আগেও ছিল ৫০-৫৫ টাকা। অর্থাৎ পাইকারি পর্যায়ে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ৬০ টাকা।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ‘পেঁয়াজের দাম বাড়ানোর পেছনে আড়তদার, কমিশন এজেন্ট ও দাদন ব্যবসায়ীদের যোগসাজশ রয়েছে। তারা মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, যাতে আমদানির সুযোগ তৈরি হয়। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর ভোক্তার পকেট কাটা যাবে।’

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ৩৫ লাখ টন, যেখানে গত মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩৮ লাখ টন। সংরক্ষণও ভালো হয়েছে। ফলে নতুন করে আমদানির প্রয়োজন নেই। দেশে এখন পেঁয়াজের ঘাটতি নয়, বরং পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তবু কিছু ব্যবসায়ী আমদানির অনুমতি (আইপি) পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ে জমা পড়েছে ২ হাজার ৮০০ আবেদন। অথচ এক মাস পরই বাজারে উঠবে নতুন দেশীয় পেঁয়াজ।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ নভেম্বরেই বাজারে আসবে। এখন আমদানি অনুমতি দিলে কৃষক ক্ষতির মুখে পড়বে। কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আলুর মতো পেঁয়াজের দরপতন হতে দেওয়া হবে না। বাজার তদারকিতে নজরদারি বাড়াতে হবে।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত এপ্রিলে দাম কিছুটা বাড়লে সীমিত আকারে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। পরে দাম কমে গেলে আর নতুন কোনো আইপি দেওয়া হয়নি। তবুও কিছু ব্যবসায়ী ব্যাংকের সহায়তায় আইপি ছাড়া এলসি খুলে পেঁয়াজ আনতে চেয়েছিল। এসব পেঁয়াজ এখন বন্দরে আটকে আছে। এ নিয়ে তারা হাইকোর্টে ১৪টি রিট করলেও এর মধ্যে ৮টি ইতোমধ্যে খারিজ হয়ে গেছে।

উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (আমদানি) বনি আমিন খান বলেন, ‘পেঁয়াজ আমদানির বিষয় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। বাণিজ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় অনুমতি না দিলে আইপি দেওয়া সম্ভব নয়। ২ হাজার ৮০০ আবেদন পড়েছে, সবই ফেরত দেওয়া হয়েছে।’

অন্যদিকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিন পর্যায়ে দাম পর্যালোচনার কাজ চলছে। হঠাৎ দামের উর্ধ্বগতির পেছনে কারা দায়ী তা খুঁজে বের করে প্রমাণ মিললেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন