শিশিরভেজা হেমন্তে দিগন্তজোড়া আমনের উৎসব

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৮, ২০২৫; সময়: ১২:২৬ pm | 
খবর > কৃষি

নাজমুল হক নাহিদ, আত্রাই:  বাংলার ষড়ঋতুর দেশে ঋতুবৈচিত্র্য শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়ায় না, বাড়ায় কৃষকের আশাও। শরতের কোমল বিদায় আর হেমন্তের নরম আগমনীতে বদলে গেছে নওগাঁর আত্রাইয়ের মাঠ-ঘাট। উপজেলার ৮ ইউনিয়নের দিগন্তজোড়া মাঠজুড়ে এখন আমন ধানের শীষে দুলছে কৃষকের স্বপ্ন।

ভোরের শিশিরভেজা সুতির মতো নরম আলোয় যখন ক্ষেতের বুক চিরে সাদা কুয়াশা ওঠে, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়েছে ধানের মাঠ। সবুজ আর হলুদের মনমাতানো রঙে একাকার এ সৌন্দর্য। ঘাসের ডগায় মুক্তোর মতো ঝুলে থাকা শিশির বিন্দু জানান দেয়-শীত খুব একটা দূরে নেই। শেষ বিকেলের ধূসর আলোয় মাঠ যেন আরেকবার প্রাণ ফিরে পায়, কুয়াশার পাতলা চাদর গায়ে জড়িয়ে নামতে থাকে সন্ধ্যা।

আত্রাই-নওগাঁ জেলার খাদ্য উৎপাদনের শীর্ষ উপজেলাগুলোর একটি। এখানে আমনের মৌসুম মানেই মাঠে উৎসবের আমেজ। কৃষকেরা কাকডাকা ভোরে ঘর থেকে বের হন, আবার ফিরে আসেন সন্ধ্যার আঁধার নেমে এলে। মাঠজুড়ে চলছে আমনের পরিচর্যার ব্যস্ততা-কেউ গাছ সোজা করে দিচ্ছে, কেউ আগাছা পরিষ্কার করছে, কেউবা পানি ধরে রাখার বাঁধ ঠিক করছে। কৃষকের পদভারে মুখরিত হয়ে উঠেছে প্রতিটি ক্ষেত।

কার্তিকের শুরুতেই শিশিরভেজা বাতাসে দুলতে থাকা ধানের গাছ জানান দিচ্ছে-এই বছর ভালো ফলন আসছে। গত বছরের তুলনায় এবার বাম্পার ফলনের সম্ভাবনার কথা মাঠের কৃষকরাও বলছেন। প্রাকৃতিক পানি সংকটের কারণে মৌসুমের শুরুতে কিছুটা চিন্তা থাকলেও এখন সেই দুশ্চিন্তার জায়গায় এসেছে স্বস্তি।

ভবানীপুর গ্রামের কৃষক আজম প্রামাণিক বলেন, “শুরুতে পানি না থাকায় ভাবনা ছিল। কিন্তু এখন গাছ বেশ ভালো আছে। আল্লাহ দিলে কোনো দুর্যোগ না হলে এবার ভালোই ফলন পাবো।”

এ দৃশ্যের আড়ালে আছে কৃষি বিভাগের নিরলস পরামর্শ ও তদারকি। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জাহিদ হাসান জানান, পাখির মাধ্যমে জমির ক্ষতিকর পোকা দমন করতে কৃষকদের কঞ্চি পুঁতে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কম মাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগ এবং আধুনিক পরিচর্যার কৌশলও শেখানো হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ প্রসেনজিৎ তালুকদার বলেন, “আমাদের প্রতিটি ব্লক পর্যায়ে গিয়ে ক্যাম্পেইন করা হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, জমির উর্বরতা বাড়ানো এবং রোগবালাই দমনে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এজন্য এ বছর মাজড়া বা কারেন্ট পোকার আক্রমণ নেই বললেই চলে।”

তার মতে, সবকিছু ঠিক থাকলে এ বছর আত্রাইয়ে আমনের বাম্পার ফলন হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

সবুজে মোড়ানো দিগন্ত, শিশির ভেজা বাতাস, কৃষকের ঘামে ভেজা পথ-এসব মিলে হেমন্তের আত্রাই আজ যেন এক জীবন্ত ফসলের ক্যানভাস। প্রতিটি শীষে ঝরে পড়ে কৃষকের পরিশ্রম, আর প্রতিটি হাওয়ায় ভেসে ওঠে তাঁর স্বপ্ন-ঘরে তোলা সোনালি ধানের প্রাচুর্য।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন