রুমিন ফারহানার বড় জয় যে কারণে

পদ্মাটাইমস ডেস্ক: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল বিশ্বরোড থেকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে আমরা রওনা হই ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা -এর বাসার উদ্দেশে। চালক আবদুল ফারুকের গন্তব্যও একই- শাহবাজপুরে রুমিন ফারহানার বাড়ি।
পথেই তিনি জানান, প্রিয় প্রার্থীর বড় জয়ে তিনি ভীষণ খুশি। এমনকি সেদিন গাড়ি না চালানোর সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন; আমরা রুমিনের বাড়িতে যাচ্ছি শুনে মত বদলান।
কথা প্রসঙ্গে ফারুক বলেন, রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও ব্যক্তিগত ভালো লাগা থেকে তিনি রুমিন ফারহানার পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন। যাত্রী ও সহচালকদের মধ্যেও ভোট চাইতে দেখা গেছে তাকে। তাঁর কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে নাসিরনগরের এক ব্যক্তি প্রার্থীর জন্য ৫০ হাজার টাকা অনুদানও দেন। দৈনিক আয় ও খরচের হিসাব তুলে ধরে তিনি বলেন, কষ্টের মধ্যেও পছন্দের প্রার্থীর জন্য কাজ করেছেন।
শাহবাজপুরে পৌঁছে দেখা যায়, বিপুল ভোটে জয়ের পর রুমিন ফারহানাকে শুভেচ্ছা জানাতে বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতা–কর্মী ও সমর্থকেরা ভিড় করছেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে এবং গত দুই দিনে বিভিন্ন পেশার মানুষের মতামত নিয়ে জানা যায়- মোটাদাগে চারটি কারণে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন তিনি।
জয়ের চার প্রধান কারণ
১. সৎ ও সাহসী ভাবমূর্তি, নারী ভোটারদের সমর্থন : স্থানীয়দের মতে, সৎ ও সাহসী নেতৃত্বের ইমেজের কারণে সাধারণ ভোটার, বিশেষ করে নারী ভোটারদের ব্যাপক সমর্থন পেয়েছেন তিনি। নির্বাচনী সভা ও উঠান বৈঠকগুলোতে নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়। ভোটের দিনও বিভিন্ন কেন্দ্রে নারী ভোটারের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো ছিল।
২. দলের দুঃসময়ের নেতা হিসেবে আস্থা : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল -এর দুঃসময়ে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তৃণমূল নেতা–কর্মীদের আস্থা অর্জন করেন রুমিন ফারহানা। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় তাঁকে। তবুও মাঠপর্যায়ের উল্লেখযোগ্য অংশ তাঁর পক্ষেই কাজ করেন।
৩. প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের দুর্বলতা ও নীরব সমর্থন : গত দেড় বছরে স্থানীয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ -এর অনেক নেতাকর্মী মামলার কারণে এলাকায় সক্রিয় ছিলেন না। অন্যদিকে বিএনপির কিছু নেতার বিরুদ্ধে মামলা-বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির অভিযোগে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। এতে একাংশের নীরব সমর্থন পান রুমিন ফারহানা -এমনটাই জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
৪. উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি ও স্থানীয় পরিচিতি : রাস্তাঘাট উন্নয়ন, গ্যাস সংযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এতে ভোটারদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়। পাশাপাশি তাঁর পৈতৃক বাড়ি এই আসনেই হওয়ায় স্থানীয় সংযোগও কাজে লেগেছে।
সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর উপজেলার আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৪৪৮ জন। এখানে নয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূল লড়াই হয় স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা (হাঁস প্রতীক) ও জোট মনোনীত প্রার্থী মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবের মধ্যে। ১৫১টি কেন্দ্র ও পোস্টাল ব্যালট মিলিয়ে হাঁস প্রতীক পায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৪৭ ভোট, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী পান ৮০ হাজার ৪৩৪ ভোট।
রুমিন ফারহানা আগে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ২০১৯ সালে সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হন। এবারের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় তাঁকে এবং তাঁর পক্ষে কাজ করা প্রায় ২০০ তৃণমূল নেতাকে বহিষ্কার করা হয়।
স্থানীয় একাধিক নেতা জানান, সাংগঠনিক বাধা সত্ত্বেও তৃণমূলের বড় অংশ তাঁর পাশে ছিলেন। নির্বাচনী প্রচারের শেষ দুই সপ্তাহে প্রায় ৪০টি সভা করেন তিনি, যার ব্যয় বহন করেন স্থানীয় সমর্থকেরা-মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নআয়ের মানুষও এতে অংশ নেন।
জয়ের পর প্রতিক্রিয়ায় রুমিন ফারহানা বলেন, নারী ভোটারদের সমর্থনই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের পুরুষ সদস্য অন্য প্রার্থীকে সমর্থন করলেও নারীরা তাঁকেই ভোট দিয়েছেন। তিনি বলেন, নারীরা যেন সহজে তাঁর কাছে এসে সমস্যা জানাতে পারেন -এ প্রতিশ্রুতিই আস্থা তৈরি করেছে।
প্রশাসনিক আচরণ নিয়ে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, শুরুতে বৈষম্যমূলক আচরণের মুখে পড়লেও শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় ভোট করতে পেরেছেন।




