হিমাগার ভাড়া কমানোর আন্দোলনে রাজশাহীতে আলু বেচাকেনা বন্ধ

প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২৬; সময়: ৫:০৪ pm | 
খবর > রাজশাহী

নিজস্ব প্রতিবেদক : হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া কমানোর দাবিতে রাজশাহীতে আলু বেচাকেনা বন্ধ করে দিয়েছেন আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা। ভাড়া পুনর্নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত হিমাগার থেকে আলু বের না করার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। কর্মসূচির প্রথম দিনেই জেলার বিভিন্ন হিমাগারে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

চাষি ও ব্যবসায়ীদের দাবি, হিমাগারের প্রকৃত ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায় উৎপাদন ও সংরক্ষণ খরচ বেড়ে গিয়ে কৃষক, ব্যবসায়ী এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে হিমাগার মালিকদের দাবি, বিদ্যুৎ, শ্রমিক ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সকালে রাজশাহীর পবা উপজেলার সরকার কোল্ড স্টোরেজে গিয়ে দেখা যায়, হিমাগার থেকে আলু বের করার কোনো কার্যক্রম চলছে না। একই চিত্র দেখা গেছে পাশের উত্তরা কোল্ড স্টোরেজেও। সাধারণ সময়ে এসব হিমাগারের সামনে আলু কেনাবেচা, লোড-আনলোড ও পরিবহনের ব্যস্ততা থাকলেও আন্দোলনের কারণে পুরো এলাকা ছিল অনেকটাই স্থবির।

আলুচাষিদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে আগের দিন সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ কর্মসূচি ঘোষণা করে রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। সংগঠনটির নেতারা জানান, হিমাগার ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হওয়ায় চাষি ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আলু বেচাকেনা বন্ধ থাকবে।

রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আহাদ আলী শাহ বলেন, একটি বস্তা আলু সংরক্ষণে হিমাগার কর্তৃপক্ষের সর্বোচ্চ ব্যয় ১০০ টাকার মতো হলেও কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৪৭৫ টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

তিনি বলেন, “এর আগেও হিমাগার ভাড়া অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছিল। তখন দেশের পরিস্থিতির কারণে সুশীল সমাজ, সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক নেতারা আমাদের ধৈর্য ধরতে বলেছিলেন। রাজনৈতিক সরকার এলে সমস্যার সমাধান হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।”

আহাদ আলী শাহ জানান, গত ১৯ এপ্রিল বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় হিমাগার থেকে আলু বেচাকেনা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “রাজশাহী জেলায় ৩৬টি হিমাগার রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রতিটি হিমাগার থেকে প্রায় এক হাজার বস্তা আলু বাজারে যায়। সে হিসেবে দিনে ৩৬ হাজার বস্তা আলু সরবরাহ হওয়ার কথা। কিন্তু আন্দোলনের কারণে সেই সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ভাড়া পুনর্নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।”

আলুচাষি হারুন বলেন, স্টোর ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে তারা সকাল থেকেই বিভিন্ন হিমাগারের সামনে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের একমাত্র দাবি, অবিলম্বে ভাড়া কমাতে হবে।

তিনি বলেন, “স্টোর ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। এতে চাষি ও ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। আমরা যৌক্তিক ভাড়া চাই। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব।”

অন্যদিকে রাজশাহীর আসমা কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য খন্দকার আউলিয়া রাজিব ওয়াহিদ বলেন, “গত বছর ভাড়া বৃদ্ধির পর কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আন্দোলনে নামেন। তখন সেনাবাহিনীর মধ্যস্থতায় ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। এবারও তারা ভাড়া কমানোর দাবি করছেন। তবে বিদ্যুৎ, শ্রমিক ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া যৌক্তিকভাবেই বাড়ানো হয়েছে।”

এদিকে আন্দোলনের কারণে জেলার আলুর বাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ সময় হিমাগার থেকে আলু সরবরাহ বন্ধ থাকলে বাজারে সংকট তৈরি হতে পারে। এতে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে আলুর দাম বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

রাজশাহী জেলা মার্কেটিং অফিসার সানোয়ার হোসেন বলেন, “একটি ব্যবসায়ী সমিতি এ আন্দোলন করছে। তারা সরকারি প্রজ্ঞাপনের নির্ধারিত মূল্যে আলু সংরক্ষণ করতে চায় না, বরং আরও কম ভাড়া দিতে চায়। এ বিষয়ে তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। আমি তাদের জানিয়েছি, চলতি মৌসুমের জন্য সরকার এখনো আলুর মূল্য নির্ধারণ করেনি। তাই এ বিষয়ে আমার কিছু করার সুযোগ নেই।”

তিনি আরও বলেন, “আলুর দাম নির্ধারিত থাকলে সমন্বয়ের চেষ্টা করা যেত। কিন্তু বাজার অর্থনীতিতে কে বেচাকেনা করবে বা করবে না, সেটি প্রশাসনিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।”

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন