নির্মাণ ব্যয় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি, সংকটে আবাসন খাত

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার এবং ক্রমবর্ধমান নিবন্ধন ব্যয়ের চাপে দেশের আবাসন খাত গভীর সংকটে পড়েছে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, আবাসন সংগঠনের নেতা ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দ্রুত নীতি সহায়তা না পেলে এই সংকট আরও তীব্র হতে পারে। তবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া গেলে আবাসন খাত আবারও দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি আবাসন প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ২০০টিরও বেশি শিল্প খাত জড়িত। ফলে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়লে রড, সিমেন্ট, সিরামিক, আসবাব, পরিবহনসহ নানা শিল্পে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফিন্যানশিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশীদ বলেন, আবাসন খাত অর্থনীতির প্রকৃত উৎপাদনশীল খাতগুলোর অন্যতম। ফ্ল্যাট বিক্রি, চাহিদা ও সরবরাহের প্রবণতা দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে কাজ করে।
তিনি জানান, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, জমির দাম বৃদ্ধি এবং ব্যাংকঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ায় ফ্ল্যাট বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ফ্ল্যাট বিক্রি প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। একসময় মাসে যেখানে প্রায় এক হাজার ইউনিট বিক্রি হতো, বর্তমানে তা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
রিহ্যাব সভাপতি আলী আফজাল বলেন, বাংলাদেশে আবাসন নিবন্ধন ব্যয় এশিয়ার মধ্যে অন্যতম বেশি, যা ১৩ শতাংশেরও বেশি। নিবন্ধন ব্যয় ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হলেও বাজেটে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
তিনি জানান, গত কয়েক বছরে নির্মাণসামগ্রীর দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকঋণের সুদহার বৃদ্ধি পাওয়ায় মধ্যবিত্ত ক্রেতারা আবাসন বাজার থেকে সরে যাচ্ছেন। নতুন কর ও শুল্ক, বিশেষ করে রডের ওপর ভ্যাট বৃদ্ধির প্রস্তাব খাতটিকে আরও চাপে ফেলবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, রড, সিমেন্ট, বালু, ইট ও পাথরসহ প্রায় ২৬৯ ধরনের নির্মাণ উপকরণের বাজারেও মন্দা বিরাজ করছে। বিক্রি কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যাংকঋণের কিস্তি ও পরিচালন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।
এডিসন রিয়েল এস্টেটের অতিরিক্ত পরিচালক (অপারেশন) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যাংক সুদের হার ১৫ থেকে ১৬ শতাংশে পৌঁছানোয় আবাসন খাতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে একটি ফ্ল্যাট নির্মাণে আগের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি খরচ হচ্ছে।
রিহ্যাবের তথ্যমতে, আবাসন খাত থেকে বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আসে এবং প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। দেশে এ খাতে ১ হাজার ৪০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। পাশাপাশি ২৬৯টি লিংকেজ শিল্প ও প্রায় ১২ হাজার প্রকল্প এই খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আবাসন খাতে বিনিয়োগ করা প্রতি ১ টাকার বিপরীতে অর্থনীতিতে ২ দশমিক ৫ টাকার বেশি প্রভাব সৃষ্টি হয়। তাই খাতটির পুনরুদ্ধারে গৃহঋণের সুদহার কমানো, নিবন্ধন ব্যয় হ্রাস, নির্মাণসামগ্রীর ওপর করের চাপ কমানো, দীর্ঘমেয়াদি আবাসন ঋণ সম্প্রসারণ এবং একটি স্বচ্ছ ও সমন্বিত আবাসন নীতি প্রণয়ন জরুরি।
আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশন লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর (অপারেশন) মো. তানভীরুল ইসলাম বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর পরিকল্পনা ও পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে আবাসন খাত আবারও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। এতে প্রকৌশলী, স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদসহ দক্ষ জনশক্তির জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, উন্নত দেশগুলোতে আবাসন খাত জিডিপির ১৫ থেকে ২৩ শতাংশ পর্যন্ত অবদান রাখে। বাংলাদেশে এ হার তুলনামূলক কম হলেও সম্ভাবনা অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি নীতি সহায়তার অভাবে আবাসন খাতের পুনরুদ্ধার বিলম্বিত হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে যথাযথ নীতি সহায়তা ও কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করা গেলে আবাসন খাত আবারও দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে উঠবে।




