মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে জবাবদিহিই আস্থার ভিত্তি

নির্ভুল শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রণয়ন ইতিহাস সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ; অতীতের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বচ্ছ অবস্থান গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে

প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬; সময়: ১২:২৩ pm | 
খবর > জাতীয়

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি জাতির আত্মপরিচয়, রাষ্ট্রচেতনা এবং স্বাধীনতার ভিত্তি। সে কারণে ১৯৭১ সালের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্ট দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা আজও জাতীয় পরিসরে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সংসদ, রাজনৈতিক অঙ্গন, শিক্ষাঙ্গন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-সব ক্ষেত্রেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নতুন করে বিতর্ক, ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন সামনে আসছে।

এই প্রেক্ষাপটে সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের একটি নির্ভুল, যাচাইকৃত এবং সর্বজনগ্রহণযোগ্য তালিকা প্রণয়নের অঙ্গীকার বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রকৃত শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সেই বাস্তবতায় প্রকৃত অবদান রাখা ব্যক্তিদের যথাযথভাবে শনাক্ত করে একটি নির্ভরযোগ্য তালিকা প্রস্তুতের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়; বরং জাতীয় ইতিহাসকে তথ্যভিত্তিকভাবে সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তি বা রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সুযোগ যত কমবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তত বেশি নির্ভুল ইতিহাস জানার সুযোগ পাবে।

সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা সামনে এনেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেনি; বরং স্বাধীনতা অর্জনের পদ্ধতি নিয়ে তাদের আপত্তি ছিল। একই সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, অবিভক্ত পাকিস্তান ধরে রাখার প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থানের সঙ্গে মিল ছিল।

তিনি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য বলেও উল্লেখ করেন। একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন চাঁদপুর জেলা জামায়াতের আমির বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, যিনি দাবি করেন তিনি ব্যক্তিগতভাবে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক ছিলেন।

তবে ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্যক্তিগত পরিচয় কিংবা পারিবারিক পটভূমি দিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের ঐতিহাসিক অবস্থান নির্ধারণ করা যায় না। একটি দলের মূল্যায়ন করতে হয় তার তৎকালীন সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক অবস্থান এবং কার্যক্রমের ভিত্তিতে।

ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। একই সঙ্গে শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সঙ্গে দলটির বহু নেতার সম্পৃক্ততার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এসব সহযোগী বাহিনীর বিরুদ্ধে গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার মতো গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের তৎকালীন শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ সহ কয়েকজনকে দোষী সাব্যস্ত করে। এসব রায় ব্যক্তিগত অপরাধের বিচার হলেও, মুক্তিযুদ্ধে দলটির নেতৃত্বের একটি অংশের ভূমিকা সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক মূল্যায়নকে আরও সুদৃঢ় করেছে।

এদিকে সম্প্রতি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ (সংশোধন) আইন, ২০২৬ পাসের মাধ্যমে সংসদ আবারও তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম পার্টি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস এবং শান্তি কমিটিকে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে আইনি স্বীকৃতি বহাল রেখেছে। এ বিধানের বিরোধিতা করেছে জামায়াতে ইসলামী।

অন্যদিকে বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতা, যার মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সালাহউদ্দিন আহমদ রয়েছেন, অভিযোগ করেছেন-স্বাধীনতাবিরোধী অতীত থাকা সত্ত্বেও জামায়াত নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক দল পরিবর্তিত হতে পারে, তাদের নীতি ও আদর্শও সময়ের সঙ্গে রূপান্তরিত হতে পারে। তবে সেই পরিবর্তনের ভিত্তি হতে হবে অতীত সম্পর্কে স্পষ্টতা, সত্যনিষ্ঠা এবং জবাবদিহি। ইতিহাসকে অস্বীকার বা নতুন ব্যাখ্যায় আড়াল করার চেষ্টা জনআস্থা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক নয়।

বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আজকের অধিকাংশ ভোটার মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেননি। তারা রাজনৈতিক দলগুলোকে বর্তমান কর্মসূচি, নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পাশাপাশি অতীতের ভূমিকা ও সেই ইতিহাস সম্পর্কে দলের অবস্থানের ভিত্তিতেও মূল্যায়ন করবেন। গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইতিহাস সম্পর্কে স্বচ্ছতা তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

এ প্রেক্ষাপটে শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের একটি নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য তালিকা প্রণয়ন শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি জাতীয় স্মৃতি সংরক্ষণ, ইতিহাস বিকৃতি রোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সত্যভিত্তিক ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।

স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করা প্রজন্ম ক্রমেই আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছেন। ফলে ১৯৭১ সালের ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও সত্য সংরক্ষণের দায়িত্ব এখন নতুন প্রজন্মের ওপর আরও বেশি করে বর্তাচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, জাতীয় ঐক্য কিংবা ভবিষ্যতের রাষ্ট্রগঠন-সবকিছুর ভিত্তি হতে পারে ঐতিহাসিক সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সম্মান জানিয়ে সেই পথেই এগিয়ে যাওয়াই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন