বান্দরবানে বন্যার ভয়াবহতা, কৃষি ও মৎস্যে ৭০ কোটির বেশি ক্ষতি

৭০ কোটির বেশি ক্ষতি, সাড়ে ৫ হাজার কৃষকের স্বপ্ন ভেসে গেল পাহাড়ি ঢলে

প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬; সময়: ৪:১০ pm | 
খবর > আঞ্চলিক

নিজস্ব প্রতিবেদক, বান্দরবান : টানা নয় দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় বান্দরবানের কৃষি ও মৎস্য খাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কয়েকদিন আগেও সবুজে মোড়া যে পাহাড়ি জনপদে লাউ, শসা, মরিচ, বেগুন, বরবটি, টমেটো ও কলার বাগান কৃষকের স্বপ্ন বুনছিল, সেখানে এখন শুধু কাদামাটি, ভাঙাচোরা ক্ষেত আর ধ্বংসস্তূপ। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, জেলায় কৃষি ও সংশ্লিষ্ট খাতে ৭০ কোটিরও বেশি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাড়ে ৫ হাজারের বেশি কৃষক।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ২ হাজার ১৫০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮৫ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। কৃষকদের পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে মৎস্য খাতও।

ঋণের বোঝা, ভেসে গেছে স্বপ্ন

সদর উপজেলার রেইছা ইউনিয়নের রত্নপুর এলাকার কৃষক কনক তংচঙ্গ্যা ব্যাংকঋণ নিয়ে কলা বাগান, বেগুন, ধনেপাতা, শিম চাষের পাশাপাশি মাছের ঘের করেছিলেন। কিন্তু বন্যার পানিতে সবকিছু তলিয়ে গেছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, পানি সব শেষ করে দিয়েছে। পুকুরের মাছও ভেসে গেছে। এখন পরিবার চালাব কীভাবে, ব্যাংকের ঋণই বা শোধ করব কী দিয়ে?

একই এলাকার মংশৈনু মারমা জানান, ঋণ নিয়ে শসা, বরবটি ও কাকরোল চাষ করেছিলেন। কিন্তু এক রাতের বন্যায় সব শেষ হয়ে গেছে। তিনি সরকারের জরুরি সহায়তা কামনা করেন।

ভরাখালী এলাকার কৃষক করিম বলেন, ব্যাংকঋণ নিয়ে ঢেঁড়স ও বেগুনের আবাদ করেছিলেন। এখন মাঠে শুধু নষ্ট ফসলের স্তূপ।

গোয়ালিয়াখোলা, দুংখি পাড়া, রত্নপুর, তারাছা, ভরাখালী ও লেমুঝিড়ির মতো একসময়কার সবজি উৎপাদনের প্রধান এলাকাগুলো এখন বন্যার ক্ষতচিহ্ন বহন করছে।

সদর উপজেলাতেই ১০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, শুধু বান্দরবান সদর উপজেলাতেই ১০ কোটি ৮১ লাখ ৯৩ হাজার টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২ হাজার ৮৫০ জন কৃষক। নষ্ট হয়েছে প্রায় ১৯ দশমিক ৯০ হেক্টর আমনের বীজতলা, ৪৫ দশমিক ৫০ হেক্টর আউশের বীজতলা, ২১৭ দশমিক ৩০ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি এবং ১৫ দশমিক ৮০ হেক্টর ফলের বাগান।

অন্যদিকে আলীকদম উপজেলায় কৃষি ও মৎস্য খাতে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেখানে অন্তত ৭৯ জন কৃষক ও মৎস্যচাষি ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

মৎস্য খাতেও বড় ধাক্কা

বন্যার পানিতে অসংখ্য মাছের ঘের ও পুকুর প্লাবিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের মধ্যে বিধু মল্লিকের প্রায় ৬ লাখ টাকা এবং আমেনা বেগমের প্রায় ৭ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে।

আলীকদম উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান জানান, উপজেলায় মৎস্য খাতে প্রায় ৫২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

প্রণোদনার আশ্বাস কৃষি বিভাগের

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু নাঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেন, আমন ও আউশের বীজতলা, সবজি ও ফলের বাগান ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। তালিকা সম্পন্ন হলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনা হবে।

সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হাসান বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে এবং কৃষকদের পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বাজারেও প্রভাব

উৎপাদন কমে যাওয়ায় বান্দরবানের স্থানীয় বাজারে সবজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক সবজির দাম প্রতি কেজি ১০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। এতে একদিকে কৃষক উৎপাদন হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন, অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তারাও উচ্চমূল্যের চাপে পড়েছেন।

পুনর্বাসনের চ্যালেঞ্জ

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বান্দরবানের কৃষি অর্থনীতি দ্রুত পুনরুদ্ধারে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে বীজ, সার, কৃষি উপকরণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং পুনর্বাসন সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় আগামী মৌসুমের উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করবে।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন