সুজানগরে তাঁত শিল্পে ভয়াবহ দুর্দিন, একের পর এক বন্ধ হচ্ছে কারখানা

প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২৫; সময়: ১০:২৫ pm | 
খবর > অর্থনীতি

এম এ আলিম রিপন, সুজানগর : কয়েক বছর আগেও ভোরের আলো ফুটতেই পাবনার সুজানগর উপজেলার কুড়িপাড়া, দুলাই, সাগরকান্দি, গোয়ারিয়া, কাঁচুরী, আহম্মদপুর, ভাটপাড়া, নিশ্চিন্তপুর, চলনা, গোপালপুর, ঘোড়াদহ, মানিকদীর ও রাধানগরসহ তাঁতপল্লিগুলো সরগরম হয়ে উঠত তাঁতের খটখট শব্দে। সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন অনেকটাই অতীত।

দফায় দফায় কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি আর আধুনিক পোশাকশিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে একের পর এক তাঁত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। লোকসানে পড়ে পেশা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন অনেক প্রান্তিক তাঁতি। আবার কেউ কেউ বাপ-দাদার পেশা বলে লোকসান সহ্য করেও আঁকড়ে ধরে আছেন তাঁতশিল্প।

সুজানগর উপজেলা পাওয়ারলুম মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান রোকন বলেন, “দেশের অন্যতম বৃহত্তম তাঁত সমৃদ্ধ এলাকা সুজানগর। এ উপজেলায় ৭ হাজার ২০০টি তাঁতের মধ্যে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় এরই মধ্যে অর্ধেকের বেশি বন্ধ হয়ে গেছে। চলমান অবস্থার উন্নতি না হলে বাকি তাঁতগুলোও বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা আছে।”

তিনি আরও জানান, উপজেলার সবচেয়ে বড় তাঁতসমৃদ্ধ এলাকা কুড়িপাড়ায় ৩ হাজার তাঁতের মধ্যে এখন দেড়-দুই হাজার কোনোভাবে চলছে। অনেক প্রান্তিক তাঁতি ইতিমধ্যেই ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছেন। বড় কারখানাগুলোও অর্ধেকের বেশি তাঁত বন্ধ রেখে কোনোমতে টিকে আছেন।

মেসার্স মোল্লা কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক ফজলুল হক মোল্লা বলেন, “সুতা, রং, কেমিক্যালসহ সব কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। অথচ উৎপাদিত কাপড়ের দাম সেভাবে বাড়েনি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ।”

কুড়িপাড়া গ্রামের আবু হানিফ সরকার আক্ষেপ করে বলেন, “এটা বাপ-দাদার পেশা। ছাড়তে পারছি না, কিন্তু লোকসান গুনতে হচ্ছে। সরকারের সহায়তা দরকার।”

আহম্মদপুরের নারী শ্রমিক আলেয়া খাতুন বলেন, “মজুরি কম, কোনো বোনাস নেই। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করেও ভালো থাকতে পারছি না। পণ্যের দাম কম, সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি।”

তাঁত মালিক আফজাল হোসেন সরকার জানান, “তিন দফা লোকসান গুনেছি। লোনের কিস্তি শোধ করতেই কারখানা বিক্রি করতে হয়েছে। এখন নতুন কোনো ব্যবসার চেষ্টা করছি।”

মানিকদীর গ্রামের হাবিবুল্লাহ জানান, “কয়েক মাস আগে যে সুতা প্রতি পাউন্ড ১৭০–১৯০ টাকায় কিনেছি, এখন তার দাম ২৮০–৩০০ টাকা। রঙের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ—২০০০ টাকার ইন্ডিয়ান রং এখন ৫০০০ টাকা কেজি। ৬০০ টাকার মাকু এখন ২০০০ টাকা এবং ৭০০ টাকার সানা কিনতে হচ্ছে ১৫০০ টাকায়। এভাবে ব্যবসা চালানো অসম্ভব।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মীর রাশেদুজ্জামান রাশেদ বলেন, “তাঁত শিল্প আমাদের ঐতিহ্য। এখানকার শিল্পীরা সত্যিই ভালো মানের পণ্য তৈরি করছেন। তাদের সমস্যাগুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।”

উৎপাদন খরচ ও বাজারমূল্যের অস্বাভাবিক বৈষম্য, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ ও আধুনিক পোশাকশিল্পের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা মিলিয়ে বাপ-দাদার পেশা ধরে রাখা দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে সুজানগরের তাঁতিদের জন্য। তাঁতশিল্প রক্ষায় সরকারি সহায়তা ও নীতিগত সমাধান এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন অনেকেই।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন