রাজশাহীর ২৬ এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব, আক্রান্ত হচ্ছেন বয়স্করাও

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহী বিভাগের ২৬টি এলাকায় সংক্রামক রোগ হাম ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশের বয়স ৬ মাসের নিচে হলেও এবার বড়রাও আক্রান্ত হচ্ছেন। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণের হার দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রোববার থেকে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে ৫২০ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ১৪৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে পজিটিভ বা উপসর্গ নিয়ে বিভাগজুড়ে ২২৯ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, যেসব এলাকায় একাধিক রোগী শনাক্ত হচ্ছে, সেগুলোকে প্রাদুর্ভাব এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত এমন ২৬টি এলাকা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পাবনায় সর্বোচ্চ ১০টি, রাজশাহীতে ৬টি (মহানগরের ভেতরে ৫টি), নওগাঁয় ৫টি, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩টি এবং নাটোর ও সিরাজগঞ্জে একটি করে এলাকা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, যেসব এলাকায় একাধিক রোগী পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোকে আউটব্রেক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এসব এলাকায় টিকাদানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বড়রাও আক্রান্ত
বর্তমানে রামেক হাসপাতালে ভর্তি ১৩২ জন রোগীর মধ্যে অন্তত চারজন প্রাপ্তবয়স্ক। তাদের মধ্যে ৫০ বছর বয়সী কাইমুদ্দীন, ৩৫ বছরের বদরুল ইসলাম এবং ১৪ বছরের শাহাদী ইসলাম রয়েছেন। তাদের মধ্যে কারও ক্ষেত্রে হাম নিশ্চিত, আবার কারও ক্ষেত্রে সন্দেহজনক হিসেবে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসকরা জানান, জ্বর, শরীরে ফুসকুড়ি, কাশি, বমি ও ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ নিয়ে রোগীরা হাসপাতালে আসছেন। অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়াসহ জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা না গেলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে। তাই দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে টিকা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছে
হামের রোগীদের চিকিৎসায় চাপ বাড়ছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে। এখানে রাজশাহী ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে রোগী ভর্তি হচ্ছেন। প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর সংখ্যা।
গত ২৯ মার্চ হাসপাতালে ভর্তি রোগী ছিল ৯৩ জন, যা পরদিন বেড়ে দাঁড়ায় ৯৮ জনে। বুধবার ছিল ১১৭ জন এবং বৃহস্পতিবার তা বেড়ে ১৩২ জনে পৌঁছায়। বুধবার দুপুর থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ২০ জন, আর ছাড়পত্র পেয়েছেন ৪ জন। আর শুক্রবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে ১২ জন। আর ছাড়পাত্র পেয়েছে ১৩ জন। এখন হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে মোট ৩৫২ জন রোগী ভর্তি আছে।
হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, ইতোমধ্যে ৪০ শয্যার একটি হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। এছাড়া শিশু ও মেডিসিন বিভাগের প্রতিটি ওয়ার্ডে আইসোলেশন কর্নার রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে একটি শিশু ওয়ার্ড সম্পূর্ণভাবে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে রূপান্তরের প্রস্তুতিও রয়েছে।
তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিশু ওয়ার্ডে অতিরিক্ত অক্সিজেন লাইন স্থাপন করা হচ্ছে। পেডিয়াট্রিক আইসিইউতে বেড সংখ্যা ১২ থেকে বাড়িয়ে ১৮টি করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২টি হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য নির্ধারিত।
হাম বা এর উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে স্পষ্ট তথ্য না থাকায় ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত একজন শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত হলেও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা যাচাই চলছে।
বুধবার ভোরে পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন ৬ মাস বয়সী আব্দুর রহমানের মৃত্যু হয়। তার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলায়। পরিবার জানায়, দীর্ঘদিন চিকিৎসার পরও তাকে বাঁচানো যায়নি। সন্তানের মৃত্যুতে পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।




