সীমান্তে আলোচিত ষষ্টি চন্দ্রকে ফিরে পেয়ে আনন্দে ভাসছে চন্দলাই গ্রাম

বিএসএফের কথিত পুশইনের শিকার বৃদ্ধ

প্রকাশিত: জুন ১২, ২০২৬; সময়: ৬:৩০ pm | 
খবর > রাজশাহী

আব্দুল বাতেন: প্রায় আড়াই মাস ধরে নিখোঁজ ছিলেন রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ললিতনগর ইউনিয়নের চন্দলাই গ্রামের বাসিন্দা ষষ্টি চন্দ্র বর্মন (৬৫)। পরিবারের সদস্যরা যখন তাকে ফিরে পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন, ঠিক তখনই দেশের আলোচিত এক সীমান্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে মিলে যায় তার সন্ধান।

জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার কামালপুর সীমান্তের শূন্যরেখায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর কথিত পুশইনের শিকার হিসেবে উদ্ধার হওয়া ওই বৃদ্ধই যে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর মোনপুর ইউনিয়নের চন্দলাই গ্রামের বাসিন্দা, তা পরে নিশ্চিত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নানা শঙ্কা আর উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে পরিবারের কাছে ফিরে এসেছেন তিনি। এতে স্বস্তি ফিরেছে স্বজনদের পাশাপাশি এলাকাবাসীর মাঝেও।

স্থানীয়রা বলছেন, দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে যেন ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে আরও সতর্কতা প্রয়োজন।

সাধারণ মানুষের মতোই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেন ষষ্টি চন্দ্র বর্মন। কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। প্রথম সংসারে তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। তবে প্রায় দশ বছর সংসার করার পর প্রথম স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যান। পরে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। বর্তমান স্ত্রী বিশ্বকা রানী ও তিন মেয়েকে নিয়ে তার সংসার। এর মধ্যে এক মেয়ের স্বামী দুই সন্তান রেখে মারা যাওয়ায় নাতি-নাতনিসহ মেয়ের ভরণপোষণের দায়িত্বও এসে পড়ে তার কাঁধে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় তিন বছর আগে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এরপর থেকেই ভবঘুরে জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। মাঝেমধ্যেই বাড়ি থেকে বের হয়ে দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকতেন। সর্বশেষ প্রায় আড়াই মাস আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাননি।

অবশেষে সীমান্তে পুশইনের ঘটনায় প্রকাশিত সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ছবি দেখে স্থানীয় লোকজন পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানান। পরে তার বড় ভাই ভবানী বর্মন ও মেজো জামাতা গৌর চন্দ্র বর্মন জামালপুরে গিয়ে বিজিবি ও পুলিশের সহায়তায় তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন।

শুক্রবার সকালে বাড়িতে ফেরার পরও কয়েক ঘণ্টার জন্য তিনি আবার সবার চোখের আড়াল হয়ে যান। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে খুঁজে এনে পরিচ্ছন্ন করে দেন। তবে কীভাবে তিনি রাজশাহী থেকে সীমান্ত এলাকায় পৌঁছালেন কিংবা সেখানে তার সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল-সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছুই বলতে পারছেন না তিনি।

ষষ্টি চন্দ্রের বড় ভাই ভবানী বর্মন ও স্ত্রী বিশ্বকা রানী জানান, মোবাইল ফোনে প্রচারিত সংবাদ দেখে পরিচিতজনেরা তাদের বিষয়টি অবহিত করেন। সীমান্তে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি তাদের ব্যথিত করেছে।

ভবানী বর্মন বলেন, “আমার ভাই দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছে। অর্থনৈতিক কষ্টের মধ্যেই তার জীবন কাটছে। না বুঝেই হয়তো সীমান্ত এলাকায় চলে গিয়েছিল। আমরা চাই, এমন ঘটনা যেন আর কারও জীবনে না ঘটে।”

তিনি আরও বলেন, “তার ভাঙাচোরা ঘরবাড়ি আর অভাবের সংসারের দিকে যদি সমাজ ও সংশ্লিষ্টরা একটু নজর দেন, তাহলে হয়তো সে কিছুটা মানসিক শান্তি পাবে।”

মেজো জামাতা গৌর চন্দ্র বর্মন বলেন, “ঘটনার খবর পাওয়ার পর আমরা জামালপুরে যাই। বিজিবি ও থানা পুলিশের সহযোগিতায় তাকে নিয়ে আসতে পেরেছি। এজন্য আমরা বিজিবির প্রতি কৃতজ্ঞ। ভুলবশত কেউ এমন পরিস্থিতিতে পড়তে পারে। তাই পরিচয় নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”

স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনদের ভাষ্য, একসময় অত্যন্ত পরিশ্রমী ও স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন ষষ্টি চন্দ্র। কিন্তু দারিদ্র্য ও মানসিক অসুস্থতার কারণে তিনি এখন কোথায় যাচ্ছেন বা কী করছেন, তা অনেক সময় বোঝা যায় না।

তারা বলেন, সীমান্তে তার সঙ্গে যা ঘটেছে, তা তাদের ব্যথিত করেছে। তবে সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো-তিনি জীবিত অবস্থায় পরিবারের কাছে ফিরে এসেছেন। এতে পুরো গ্রাম যেন আনন্দে ভেসে উঠেছে।

মোহনপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা হোসেনসহ এলাকাবাসীর দাবি, ষষ্টি চন্দ্রের ভাঙাচোরা ঘরবাড়ি মেরামত এবং তার পরিবারের কর্মসংস্থানের বিষয়ে সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত। এতে পরিবারটি যেমন উপকৃত হবে, তেমনি ষষ্টি চন্দ্রও মানসিকভাবে কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেতে পারেন।

এদিকে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কথিত পুশইন এবং তা প্রতিরোধে বিজিবির ভূমিকা নিয়ে যখন দেশজুড়ে আলোচনা চলছে, তখন সঠিক পরিচয় শনাক্তের মাধ্যমে ষষ্টি চন্দ্রের পরিবারের কাছে ফিরে আসার ঘটনাটি স্বস্তির বার্তা হয়ে এসেছে। শঙ্কা আর অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে ঘরে ফেরা এই বৃদ্ধকে ঘিরে এখন আনন্দের আবহ তার পুরো গ্রামজুড়ে। একই সঙ্গে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে আরও মানবিক ও দায়িত্বশীল আচরণের প্রত্যাশা করেছেন স্থানীয়রা।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন