মাছির ঝাঁক, দুর্বিষহ দিন কাটছে গোদাগাড়ীর এক গ্রামবাসীর

খামারের বর্জ্যে পরিবেশ দূষণ, শ্বশুরবাড়িতে আসা বন্ধ মেয়ে-জামাইদের

প্রকাশিত: জুন ২৪, ২০২৬; সময়: ২:১১ pm | 
খবর > রাজশাহী

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী : রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের ঈশ্বরীপুর গ্রামে একটি লেয়ার মুরগির খামারের দুর্গন্ধ ও মাছির উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। খামারের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে মুরগির বিষ্ঠা জমিয়ে রাখা এবং দুর্গন্ধনাশক পদার্থ ব্যবহার না করায় পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রশাসনের তদন্তেও অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। তদন্ত প্রতিবেদন পরিবেশ অধিদপ্তরে পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গ্রামবাসী।

সম্প্রতি সরেজমিনে খামার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, খামারের ভেতরে কয়েক সপ্তাহের মুরগির বিষ্ঠা জমে রয়েছে। সেখানে অসংখ্য মাছির বিচরণ। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের বসতবাড়িতেও। মাছির উপদ্রবে ঘরে খাবার রাখা কিংবা স্বাভাবিকভাবে খাওয়া-দাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের তথ্যমতে, ঈশ্বরীপুর গ্রামে প্রায় ১২০টি পরিবারের ৬৪২ জন মানুষের বসবাস। স্বপন নামের এক ব্যক্তির মালিকানাধীন খামারটি থেকে গত তিন মাস ধরে দুর্গন্ধ ও মাছির উপদ্রব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা।

গ্রামের বাসিন্দা রোহেনা বেগম বলেন, “তরকারি রান্না করে রাখতে পারি না। খাবার পরিবেশন করলেই ভাত ও তরকারিতে মাছি এসে পড়ে। পরিবারের সদস্যদের ঠিকমতো খাবার দিতে পারছি না। মাছির কারণে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।”

তিনি জানান, আগে খামারটিতে সোনালি জাতের মুরগি পালন করা হলেও তখন বর্তমানের মতো মাছির উপদ্রব ছিল না। এখন ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে বাড়িতে বসবাস করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত প্রতিকার না পেলে আদালতের আশ্রয় নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

কয়েক দিন আগে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দেওয়া গৃহিণী লিপি খাতুন বলেন, “নবজাতকের শরীর ও মুখে মাছি বসে থাকে। সব সময় মশারি টাঙিয়ে রাখতে হচ্ছে। ঘরে খাবার রাখলেই মাছি ঘিরে ধরে। শিশুকে নিয়ে সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে।”

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, “মাছির অত্যাচারে আত্মীয়স্বজন বাড়িতে আসতে চান না। জামাইকে খেতে দিলে খাবারের ওপর মাছি বসে। ঘেন্না ও অস্বস্তির কারণে এখন সেও বাড়িতে আসে না।”

তিনি বলেন, “গ্রামের মানুষের স্বাভাবিক রান্নাবান্না ও খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অনেক সময় খাবারের সঙ্গে মাছিও মুখে চলে যাচ্ছে।”

গ্রামবাসীরা জানান, প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং পরিবেশ অধিদপ্তরে একাধিকবার লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের পর পরিবেশ অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও ভূমি কার্যালয়ের প্রতিনিধিরা এলাকা পরিদর্শন করলেও এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনেও অভিযোগের সত্যতা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খামারে সৃষ্ট মুরগির বর্জ্যের দুর্গন্ধ গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণ করছে। এতে জনসাধারণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গবাদিপশুকে খাবার খাওয়ানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, খামারে দুর্গন্ধনাশক পদার্থ ব্যবহার না করায় পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। মুরগির বাচ্চা ও ডিম উৎপাদনের সময় সৃষ্ট বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে রাখা হলেও পরিবেশ সুরক্ষায় সরকার অনুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। পাশাপাশি খামারটির কার্যক্রম স্থানীয় জনজীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে কি না, তা যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রতিবেদনটি পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ের উপপরিচালক মোছা. তাছমিনা খাতুন বলেন, “গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন আমরা পেয়েছি। খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশগত অনুমোদনের বিষয়গুলো যাচাই করা হয়েছে। সেখানে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই খামারমালিকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে অভিযোগের বিষয়ে খামারমালিক স্বপনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে দ্রুত খামারের বর্জ্য অপসারণ, মাছি ও দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত তদারকির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অন্যথায় এলাকায় রোগবালাই ছড়িয়ে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন