গণমাধ্যমের নিরাপত্তায় সরকারের আশ্বাস
সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা, নবম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন ও গণমাধ্যম উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ নিরাপত্তায় নীতিগত সহায়তার প্রতিশ্রুতি

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও শক্তিশালী গণমাধ্যম গড়ে তুলতে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা এবং গণমাধ্যম উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের নীতিগত সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে সরকার। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সুসংহত করতে হলে গণমাধ্যমশিল্পকে টিকিয়ে রাখা অপরিহার্য। প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির মাধ্যমে হলেও এই শিল্পকে সুরক্ষা দিতে হবে, কারণ একটি স্বাধীন গণমাধ্যমই জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র ও উন্নত সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর বসুন্ধরায় ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের কার্যালয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের চিত্র আমূল বদলে যাচ্ছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় প্রচলিত সংবাদমাধ্যমকে টিকে থাকতে হলে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং সময়োপযোগী আইনি কাঠামো গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় দেশের গণমাধ্যম আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, দেশের অন্যান্য শিল্পখাতের মতো গণমাধ্যমও রাষ্ট্রীয় সহায়তার দাবি রাখে। কারণ এই শিল্প কেবল একটি ব্যবসা নয়; এটি গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সামাজিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের কারণে সংবাদমাধ্যমের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বর্তমানে তথ্য গ্রহণের ধরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্বতন্ত্র কনটেন্ট নির্মাতাদের উত্থানে বিজ্ঞাপনের বড় অংশ ডিজিটাল মাধ্যমে চলে যাচ্ছে। ফলে মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে বহুমাধ্যমভিত্তিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন আয়ের উৎস তৈরি করতে হচ্ছে। এই বাস্তবতায় সংবাদমাধ্যমকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনের ক্ষেত্রে পাঠক ও দর্শকসংখ্যাকে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে তথ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও টেকসই গণমাধ্যম ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে গণমাধ্যম সংস্কার, প্রয়োজনীয় কমিশন গঠন এবং অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নবম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন ছাড়া সাংবাদিকদের সম্মানজনক বেতন, চাকরির স্থায়িত্ব এবং পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি গণমাধ্যম উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সুরক্ষায়ও রাষ্ট্রকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। সাংবাদিকদের আর্থিক অনিশ্চয়তা দূর করা না গেলে পেশাদার সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং অপসাংবাদিকতার সুযোগ বাড়বে।
মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিবন্ধিত অনলাইন সংবাদমাধ্যমের জন্য পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন, সব নিবন্ধিত গণমাধ্যমকে সরকারি বিজ্ঞাপনের আওতায় আনা, স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠন, সাংবাদিক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু, বিজ্ঞাপন বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং সাংবাদিকদের জন্য পেনশন ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান।
ডেইলি সানের সম্পাদক রেজাউল করিম লোটাস বলেন, সরকার স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রতি সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছে। এর প্রতিদানে সাংবাদিকদেরও দেশ ও জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা উচিত।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক লোটন একরাম বলেন, ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের গণমাধ্যমগুলোর পাঠক ও দর্শকসংখ্যা বেশি হলেও সরকারি বিজ্ঞাপন ও ক্রোড়পত্র বরাদ্দে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি সার্কুলেশনভিত্তিক বিজ্ঞাপন বণ্টন, ডিএফপির কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, সাংবাদিকদের পেনশন ব্যবস্থা এবং স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের দাবি জানান।
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু নিবন্ধিত অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে সরকারি বিজ্ঞাপন নীতিমালার আওতায় আনার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক এ. কে. এম. মন্জুরুল ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বসুন্ধরা গ্রুপের বিভিন্ন গণমাধ্যম নানা ধরনের বৈষম্য ও হয়রানির শিকার হয়েছে। এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তিনি তথ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
নিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম খান বলেন, সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাছির জামাল আশা প্রকাশ করে বলেন, সরকারের ঘোষিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সাংবাদিকদের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যার কার্যকর সমাধান হবে।
অনুষ্ঠানে ডেইলি সান, বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালের কণ্ঠ, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর ডটকম, নিউজ টোয়েন্টিফোরসহ ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।




