রাজশাহীতে জুলাইযোদ্ধাদের চাপে প্রেসক্লাব বন্ধ রাখার পরামর্শ ইউএনওর

নিজস্ব প্রতিবেদক: জুলাইযোদ্ধাদের দাবিকে ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাজশাহীর গোদাগাড়ী প্রেসক্লাব সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুস সাদাত রত্ন। শনিবার সকালে প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার উপজেলা প্রতিনিধি সাইফুল ইসলামকে ডেকে তিনি এ পরামর্শ দেন বলে জানা গেছে।
তবে সাংবাদিকদের অভিযোগ, প্রেসক্লাব সাংবাদিকদের নিজস্ব নীতিমালায় পরিচালিত হয়। সেখানে প্রশাসনিক বা অন্য কোনো হস্তক্ষেপ স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি হতে পারে। ইউএনওর এমন অবস্থানের নিন্দা জানিয়ে তাঁকে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত গোদাগাড়ী প্রেসক্লাব ২০০৯ সালে উপজেলা সদরের ডাইংপাড়া মোড়ে নিজস্ব এককক্ষ ভবনে কার্যক্রম শুরু করে। দীর্ঘদিন এর সভাপতি ছিলেন আলমগীর কবির তোতা। তাঁকে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে অভিযোগ তুলে প্রেসক্লাবটি দখলের চেষ্টা চলছে বলে দাবি করা হয়। সম্প্রতি নতুন কমিটি গঠনের পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি।
এদিকে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জুলাইযোদ্ধা’ নামে একটি সংগঠন সম্প্রতি গোদাগাড়ীতে গড়ে ওঠে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে প্রেসক্লাব ভবন নিজেদের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. মুরশালিন গত ২৪ মার্চ ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। এতে প্রেসক্লাবে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের অভিযোগ তোলা হয়। অভিযোগের পরদিনই তাঁর নেতৃত্বে প্রেসক্লাবে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। পরে সাংবাদিকরা তালা ভেঙে প্রবেশ করলেও নিরাপত্তা শঙ্কায় সেখানে নিয়মিত বসতে পারছেন না।
প্রেসক্লাব সভাপতি সাইফুল ইসলাম জানান, ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় প্রেসক্লাবে অবস্থানকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা কমিটির সাবেক সদস্য সচিব মো. রহমতুল্লাহসহ কয়েকজন সেখানে গিয়ে অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ক্লাব না খোলার অনুরোধ জানান। এরপর থেকেই সাংবাদিকরা কার্যত ক্লাব ব্যবহার করতে পারছেন না।
সংগঠনটির সভাপতি সাবিয়ার রহমান মিল্টন বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই জুলাই আন্দোলনের আহতদের জন্য প্রেসক্লাবে অফিস করার দাবি উঠেছিল, যা তিনি কয়েকবার ঠেকিয়েছেন।
সাইফুল ইসলাম আরও জানান, প্রেসক্লাব দখলের চেষ্টার বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এখন কিছু ব্যক্তি প্রেসক্লাব ভবন গুঁড়িয়ে সেখানে পাবলিক টয়লেট বা যাত্রী ছাউনি নির্মাণের কথাও বলছেন।
তিনি বলেন, শনিবার সকালে ইউএনও তাঁকে ডেকে বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছুদিন প্রেসক্লাব বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন এবং এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ ‘ঠিক হয়নি’ বলেও মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, জুলাইযোদ্ধাদের সঙ্গে সমঝোতা করাই ভালো।
এ বিষয়ে রাজশাহী এডিটরস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবীব অপু বলেন, “প্রেসক্লাব সাংবাদিকদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান। এখানে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী। একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন মন্তব্য বিভ্রান্তিকর বার্তা দিতে পারে।”
তবে ইউএনও নাজমুস সাদাত রত্ন বলেন, প্রেসক্লাব সভাপতির সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে, কিন্তু সরাসরি বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়নি। বিস্তারিত জানতে অফিসে এসে কথা বলার অনুরোধ জানান তিনি।
অন্যদিকে মো. রহমতুল্লাহ বলেন, প্রেসক্লাবটি সরকারি জায়গায় অবস্থিত। তাই সেখানে সাংবাদিকদের কার্যক্রম পরিচালনা প্রশ্নবিদ্ধ। প্রয়োজনে অন্যত্র প্রেসক্লাব হলে তিনি ভাড়া দেওয়ার প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি অতীতে এ প্রেসক্লাব থেকে ‘অসৎ কর্মকাণ্ড’ হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, অতীতেও গোদাগাড়ী প্রেসক্লাব একাধিকবার হামলা ও ভাঙচুরের শিকার হয়েছে। ২০১০ সালে একটি সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে তৎকালীন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের নির্দেশে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০১৩ সালে রাজনৈতিক ক্ষোভে বুলডোজার দিয়ে ভবনটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সংস্কারের মাধ্যমে পুনরায় চালু করা হলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দিন অগ্নিসংযোগে ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘ ১৯ মাস বন্ধ থাকার পর চলতি মাসে সংস্কার শেষে আবার কার্যক্রম শুরু হয়।




