নদীর মাছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা, বাড়ছে খাদ্যনিরাপত্তার শঙ্কা

প্রকাশিত: জুন ২৫, ২০২৬; সময়: ৪:৫৯ pm | 
খবর > জাতীয়

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক কার্পজাতীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র হালদা নদী এখন নতুন এক পরিবেশগত হুমকির মুখে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় নদীর বিভিন্ন প্রজাতির মাছের শরীরে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা জীববৈচিত্র্য ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

গবেষণা অনুযায়ী, হালদা থেকে সংগ্রহ করা আট প্রজাতির ৪৮টি মাছের প্রতিটির শরীরেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। গবেষকদের ভাষ্য, নদীতে ফেলা প্লাস্টিক বর্জ্য সময়ের সঙ্গে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মাছের শরীরে প্রবেশ করছে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরেও পৌঁছানোর ঝুঁকি তৈরি করছে।

গবেষণাটি ‘হালদা নদীর মাছের মধ্যে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক দূষণ: বাংলাদেশের একটি প্রাকৃতিক কার্প প্রজননক্ষেত্র’ শিরোনামে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর জীববিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ঢাকা ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্স-এ।

গবেষক দলের সদস্য ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-এর হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক মো. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, প্লাস্টিক দূষণের উৎস বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে হালদার মাছের প্রজনন ও সামগ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি মাছের পরিপাকতন্ত্রে গড়ে ৬ দশমিক ৫টি এবং মাংসপেশিতে গড়ে ৬টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, প্লাস্টিক কণা শুধু মাছের পাকস্থলীতে সীমাবদ্ধ নয়, মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত অংশেও প্রবেশ করছে।

সবচেয়ে বেশি দূষণ পাওয়া গেছে শিলন মাছে। এ মাছের পরিপাকতন্ত্রে গড়ে ১০ দশমিক ৮টি এবং মাংসে ৮ দশমিক ২টি প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে।

গবেষকেরা তন্তু, পাতলা স্তর, ভাঙা টুকরা, ফেনা ও দানাদার -এই পাঁচ ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে তন্তুজাত কণার উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। মাছের মাংসে পাওয়া কণার ৮০ শতাংশের বেশি ছিল ৫০০ মাইক্রোমিটারেরও কম আকারের।

রাসায়নিক বিশ্লেষণে পলিপ্রোপিলিন, পলিথিলিন, পলিয়েস্টার ও পিইটিই ধরনের প্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, প্যাকেটজাত পণ্যের মোড়ক, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং বস্ত্রশিল্পের বর্জ্য এসব দূষণের প্রধান উৎস।

হালদার সঙ্গে যুক্ত ১৯টি খালের মাধ্যমে বিভিন্ন আবাসিক এলাকা, বাজার ও শিল্পকারখানার বর্জ্য নদীতে প্রবেশ করছে। বিশেষ করে খন্দকিয়া, কৃষ্ণখালী, কাটাখালী, মাদারী ও বোয়ালিয়া খালকে দূষণের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। খন্দকিয়া খালের মাধ্যমে কালুরঘাট শিল্পাঞ্চলের বর্জ্য সরাসরি নদীতে মিশছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

হালদা নদীর পরিবেশ রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক। তাঁর মতে, অপরিশোধিত শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্য, অবৈধ বালু উত্তোলন এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে নদীটি ক্রমেই সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেছেন, গবেষকদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নির্ধারণ এবং হালদাকে দূষণের হাত থেকে রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক কার্প প্রজননক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত হালদা নদী খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার পাহাড়ি এলাকা থেকে উৎপন্ন হয়ে ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও রাউজান অতিক্রম করে কর্ণফুলী নদী-তে মিলিত হয়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে নদীটির অনন্য জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদ বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন