মাদক দমনে সরকারের সামনে কঠিন বাস্তবতা

প্রকাশিত: জুন ২৩, ২০২৬; সময়: ২:৫৭ pm | 
খবর > জাতীয়

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক মাত্রা পেয়েছে। প্রচলিত ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজার পাশাপাশি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে নানা ধরনের সিনথেটিক বা কৃত্রিম মাদক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান, কঠোর আইন এবং সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণার পরও মাদক ব্যবসা ও সেবন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। ফলে মাদক দমন এখন সরকারের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন প্রয়োগ করেই মাদকের বিস্তার রোধ সম্ভব নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক প্রতিরোধ, দ্রুত বিচার এবং কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থাও সমানভাবে জরুরি।

আধুনিক সিঙ্গাপুরের স্থপতি ও দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ মাদককে সব ধরনের অপরাধের অন্যতম উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৭৩ সালে প্রণীত ‘মিসইউজ অব ড্রাগস অ্যাক্ট’-এর আওতায় মাদক পাচার ও সংরক্ষণের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান করা হয়। একই সঙ্গে দেশটির সেন্ট্রাল নারকোটিকস ব্যুরোকে (সিএনবি) ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়। এর ফলে সিঙ্গাপুর বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম মাদকনিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত।

শুধু সিঙ্গাপুর নয়, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, কুয়েত ও কাতারসহ বিভিন্ন দেশও মাদক পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কিছু দেশে এখনো মাদক পাচারের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ঘোষিত ‘ওয়ার অন ড্রাগস’ নীতির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করে। অন্যদিকে ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের বিতর্কিত মাদকবিরোধী অভিযান আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত হলেও অনেক বিশ্লেষকের মতে, তা দেশটিতে মাদক নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার এখন সামাজিক ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অন্যতম বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে বাড়ছে মাদকাসক্তি। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবার, সমাজ ও অর্থনীতিতে।

অপরাধ বিশ্লেষকদের ভাষ্য, হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, কিশোর গ্যাং এবং অস্ত্র ব্যবসাসহ নানা অপরাধের সঙ্গে মাদকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। মাদক সিন্ডিকেটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে চোরাচালান ও মানবপাচার চক্রও।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে। সরকারের নির্দেশনায় দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন,

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সারা দেশে ৩০ হাজার ৭৪৪টি মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এসব অভিযানে ৯ হাজার ২৫১টি মামলা দায়ের এবং ৯ হাজার ৬৮৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সরকারি সূত্র জানিয়েছে, শীর্ষ মাদক কারবারিদের একটি হালনাগাদ তালিকা প্রস্তুতের কাজও চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শত শত গডফাদার ও হাজার হাজার মাদক ব্যবসায়ীর তথ্য সংগ্রহ করে তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

তবে অতীতে প্রণীত মাদক কারবারিদের তালিকাগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব ও নানা কারণে অনেক ক্ষেত্রে বড় মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদকের বিস্তার। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশে এমডিএমএ, এলএসডি, আইস, ফেন্টানাইল, কিটামিন, ডিএমটি, ম্যাজিক মাশরুম, কুশসহ বিভিন্ন কৃত্রিম মাদকের ব্যবহার বাড়ছে।

চিকিৎসকদের মতে, এসব মাদক অত্যন্ত দ্রুত আসক্তি তৈরি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে মানসিক ও শারীরিক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ায়। সময়মতো নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়তে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রধান বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, মামলার দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, বিচারিক প্রক্রিয়ার দুর্বলতা, সীমান্তপথে চোরাচালান এবং সামাজিক সচেতনতার অভাব।

আইনে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া ও দুর্বল তদন্তের কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে বহুমাত্রিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে শীর্ষ মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি, পুনর্বাসন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি এবং ডোপ টেস্ট কার্যকর বাস্তবায়ন।

তাদের মতে, কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়; সমাজের সব স্তর এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য, মাদক নিয়ন্ত্রণ শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, জননিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। ফলে মাদকবিরোধী লড়াইয়ে দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন বর্তমান সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

তাদের সতর্কবার্তা, মাদকের বিস্তার রোধ করা না গেলে উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা দীর্ঘমেয়াদে হুমকির মুখে পড়বে। তাই মাদকবিরোধী যুদ্ধকে কেবল প্রশাসনিক অভিযান নয়, জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে দেখার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন