লোভে টাকা বিনিয়োগ, উল্টো ঋণের বোঝা ধরিয়ে দিয়েছে এমটিএফই অ্যাপ

প্রকাশিত: আগস্ট ২১, ২০২৩; সময়: ৪:০৬ pm | 
খবর > আঞ্চলিক

নিজস্ব প্রতিবেদক, নওগাঁ: এমটিএফই নামের একটি অ্যাপ ব্যবহার করে অতি মুনাফার লোভে টাকা বিনিয়োগ করে নওগাঁর কয়েক হাজার মানুষ প্রতারণার শিকার হয়েছেন। শহর কিংবা গ্রাম সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল অ্যাপটি। যেখানে প্রতিদিন সাধারণ মানুষ টাকা বিনি য়োগ করে দ্রুত আয় করার স্বপ্ন দেখছিলেন। হঠাৎ করে অ্যাপটি থেকে বিনিয়োগকারীরা কোনো টাকা উঠাতে পারছেন না। উল্টো বিনিয়োগকারীদের এমটিএফই অ্যাপের মাধ্যমে তাঁদেরকে ঋণের বোঝা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগী একাধিক বিনিয়োগকারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ গ্রুপ (এমটিএফই) একটি অনলাইন ট্রেডিংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। এমটিএফই অ্যাপটি চালু থাকা অবস্থায় একাউন্ট চালু করার জন্য সর্বনিম্ন ২৬ ডলারের সমপরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করতে হতো। সেই টাকা বিনিয়োগ করলে প্রতিদিন লভ্যাংশের একটা নির্দিষ্ট পরিমান টাকা পাবেন বিনিয়োগকারীরা। আর এসব প্রলোভন দেখিয়ে প্রচারণা করছিলেন কিছু যুবক। আর এতেই হুমড়ি খেয়ে অ্যাপটিতে এ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

সেই অ্যাকাউন্টে কেউ জমি বন্ধক রেখে, কেউবা জমানো টাকা আবার কেউবা বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ করে হাজার হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। নওগাঁয় এমটিএফই প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করতেন। এদেরকে বিনিয়োগকারীরা চিনের এমটিএফই-এর সিও হিসেবে। এই প্রতিনিধিরা কাউকে অ্যাকাউন্ট খুলে দিলে কোম্পানি থেকে তাঁরা একটা কমিশনও পেতেন।

ভুক্তভোগীরা আরও জানান, এই আ্যাপে অ্যাকাউন্ট খোলার পর বিনোয়াগ করা টাকার ওপর নির্দিষ্ট পরিমান টাকা জমা হতো। গত সোমবার থেকে হঠাৎ করে সেই সব অ্যাকাউন্ট থেকে তারা আর টাকা উঠাতে পারছেন না। এমটিএফই অ্যাপ ব্যবহার করে প্রতারণা করে তাদের টাকা নিয়ে উধাও হয়েছে একটি চক্র। লাভের আশায় এসে উল্টা ঋনের বোঝাও ধরিয়ে দিয়েছে এমটিএফই। এতে করে যারা দ্রুত আয় করার স্বপ্ন নিয়ে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন তারা এখন সর্বস্বান্ত। তবে প্রথম দিকে যারা বিনিয়োগ করেছিলেন, তারা মূলধন ও কিছু মুনাফা তুলতে নিতে পেরেছিলেন। তবে শেষের দিকে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা কোনো টাকা উঠাতে পারেননি।

নওগাঁ শহরের চকদেবপাড়া এলাকার বাসিন্দা মাসুদ রানা নামের এক যুবক বলেন, ‘আমার এক বন্ধুর কথা শুনে লাভের আশায় জমানো ১ লাখ টাকা এমটিএফই অ্যাপে বিনিয়োগ করেছিলাম। কিছুদিন ওই অ্যাপ থেকে ওই টাকার উপর লাভও পাইছি। কিন্তু হঠাৎ করে কিছুদিন আগে থেকে অ্যাপটি থেকে টাকা আর টাকা উঠানো যাচ্ছে না। উল্টো বিনিয়োগ করা টাকা কমতে কমতে ব্যালান্স মাইনাস হয়ে গেছে।

এখন শুনছি ওই অ্যাপ নাতি বন্ধু হয়ে গেছে। প্রতারক চক্র টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেছে। আমার অ্যাকাউন্টে ১ হাজার ডলার নেগেটিভ ব্যালান্স হওয়ায় সেই ডলার পরিশোধ করার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সেই ডলার পরিশোধ না করলে নাকি আমার বিরুদ্ধে মামলাও করা হবে। লাভের আশায় এসে উল্টো ঋণের বোঝা ধরিয়ে দিয়েছে এমটিএফই।’

ভুক্তভোগীদের মাধ্যমে এমটিএফই অ্যাপের সিও হিসেবে পরিচয়দানকারী রানীনগর উপজেলার রাব্বী হোসেন নামে এক যুবক বলেন, প্রথমে মহাদেবপুর উপজেলার লতিফুল নামে একজন তাঁকে লিংক দিয়েছিলেন এবং সেখানে কাজ করার জন্য বলেন। পরে তিনি সেখানে বিনোয়োগ করেন এবং বেশ কয়েকজনকে উদ্বুদ্ধ করেন। তবে কাউকে কোনো ধরণের প্রলোভন দেখানো হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।

যোগাযোগ করা হলে লতিফুল লিটন নামের ওই যুবক দাবি করেন, এমটিএফই অ্যাপের আমি কোনো সিও না। তবে আমি ও আমার কয়েকজন বন্ধু নিজের মত করে এমটিএফই অ্যাপে কাজ করতাম। এই অ্যাপে দেড় লাখ টাকা বিনিয়োগ করে আমি নিজেও ধরা খেয়েছি। নওগাঁতে আমার মতো হাজার হাজার মানুষ প্রতারিত হয়েছেন। আমরা শুরুর দিকে এই অ্যাপে বিনিয়োগ করায় অন্যরা ভাবছে হয়তো আমরাই টাকাগুলো মেরে দিয়েছি। এটি বিদেশ থেকে নিয়ন্ত্রিত একটি অ্যাপ। বিনিয়োগকারীদের আত্মসাৎ করা টাকা অ্যাপের মাধ্যমে বিদেশে চলে গেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নওগাঁর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গাজিউর রহমান বলেন, এ বিষয়ে আমাদের কাছে এখনও কেউ কোনো অভিযাগ করেনি কিংবা থানায় কোনো মামলাও করেনি। কোনো ভুক্তভোগী অভিয়োগ করলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেহেতু আপনার মাধ্যমেই এরকম ঘটনা প্রথম শুনলাম। আমরা বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখব।

 

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন