চালের দাম বাড়ছে ৮ কারণে

প্রকাশিত: জুলাই ১, ২০২৪; সময়: ১২:২১ অপরাহ্ণ |
চালের দাম বাড়ছে ৮ কারণে

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : সবে শেষ হওয়া বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন হলেও ফের নানা ফন্দিতে চালের বাজার অস্থির করে তুলতে সংঘবদ্ধ চক্র তৎপর হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে তারা নানা খোঁড়া যুক্তি তুলে পাইকারি বাজারে সব ধরনের চালের দাম কেজিপ্রতি দুই থেকে আড়াই টাকা বাড়িয়েছে। বৈধ-অবৈধ গুদামে মজুত বাড়িয়ে দিয়ে বাজারে কমিয়েছে সরবরাহ। যার প্রভাবে এরই মধ্যে বাজার চড়তে শুরু করেছে।

বাজার পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, চাল নিয়ে চালবাজির সঙ্গে জড়িতদের লাগাম এখনই টেনে ধরা না গেলে ভর বর্ষায় চালের বাজারে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা দেখা দেবে। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে এ সিন্ডিকেট স্বল্পসময়ে হাতিয়ে শত শত কোটি টাকা নিতে পারে। আর পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বিদেশ থেকে চাল আমদানির উদ্যোগ নিলে তাতে পরোক্ষভাবে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এ বছর ফলন ভালো হওয়ায় গত এক দেড় মাস ধরে চালের বাজার স্থিতিশীল ছিল। বাজারে সরবরাহও ছিল ভালো। তবে ঈদের পর ধানের দাম ও পরিবহণ ভাড়া বৃদ্ধি এবং টানা বৃষ্টির অজুহাত দেখিয়ে মিলাররা চালের দাম বস্তায় ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে।

তবে মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে চালের বাজার অস্থির করতে চালবাজ সিন্ডিকেটের নানা ফন্দি আঁটার তথ্য পাওয়া গেছে। জানা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারিভাবে বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় খাদ্যশস্য বিতরণ হয়েছে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। ফলে সরকারের গুদাম ধান-চাল-গমের মজুত কমেছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সরকারি গুদামে গত ২৬ জুন চালের মজুত ৯ লাখ ৪৬ হাজার ৯৪৭ টন, গমের মজুত ৪ লাখ ৭ হাজার ৮৪৩ টন এবং ধানের মজুত ১ লাখ ১৭ হাজার ৬৮৪ টন। চাল সিন্ডিকেট সরকারের ঘাটতি মজুতের এই সুযোগ কাজে লাগাতে চাচ্ছে।

অন্যদিকে চালের দাম নিয়ন্ত্রণ ও চাহিদা মেটানোর জন্য ২০২০-২১ অর্থবছরে ৪ লাখ ৫২ হাজার টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছয় লাখ টন চাল আমদানি করে সরকার। কিন্তু চলতি বছর দেশের মানুষের প্রধান এ খাদ্যপণ্যটি আমদানি করা হয়নি। ফলে সরকারি গুদামগুলোকে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের ওপরই পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে চালের বাজার অস্থির করে তোলার পাঁয়তারা চলছে বলেও মনে করেন

বাজার সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে চলতি বোরো মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান সফল হওয়া নিয়ে যে সংশয় রয়েছে, চাল সিন্ডিকেট এর ফায়দা লুটতে চাচ্ছে। জানা গেছে, জুনের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক ধান-চাল কেনা সম্ভব হয়নি। চলতি মৌসুমে পাঁচ লাখ টন ধান কেনার ঘোষণা দেওয়া হলেও এক মাসে কেনা সম্ভব হয়েছে মাত্র ৩৮ হাজার ১২০ টন ধান। আর আতপ চাল সংগ্রহের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ টন। পরে লক্ষ্যমাত্রা ৫০ হাজার টন বাড়ানো হয়। কিন্তু এ পর্যন্ত ৬০ হাজার ১৭৫ টন আতপ চাল সংগ্রহ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪০ শতাংশ। যদিও গত ৭ মে শুরু হওয়া ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে। তবে নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্যমাত্রার ৭০ শতাংশও অর্জিত হবে বলে আশঙ্কা অনেকের।

মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষকরা যাতে ন্যায্যমূল্য পান এজন্য এ বছর ধানের দাম কেজিপ্রতি ২ টাকা বাড়ানো হলেও তার সুফল গৃহস্থ কিংবা সরকার কেউই পায়নি। কেননা এ বছর ধান কাটা শুরু হয় ১৫ এপ্রিল। আর সরকার ধান কেনা শুরু করে ৭ মে। অর্থাৎ সরকারের ধান কেনা শুরুর আগেই মহাজনের কাছে ধান বিক্রি করেন অনেক কৃষক। এ কারণেও ধান সংগ্রহে পিছিয়ে পড়েছে সরকার। এছাড়া কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার নানা জটিলতায় তারা সরকারের কাছে ধান বিক্রিতে আগ্রহী হয় না। বরাবরের মতো এ সংকট এবারও রয়ে গেছে। ফলে চালকল মালিক ও মজুতদাররা নির্বিঘ্নে সে সুযোগ নিয়ে চালের দাম বাড়াতে পারছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সারাদেশে ৫০ লাখ ৫৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। এবার বোরোতে চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ কোটি ২২ লাখ টন। সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শুধু হাওড়ে চার লাখ ৫৩ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। আর তাতে ৫০ হাজার টন বেশি উৎপাদনও হয়েছে।

এ হিসেবে ভর মৌসুমে চালের দাম কেজি দুই-তিন টাকা বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই বলে মনে করেন খাদ্যপণ্যের বাজার পর্যবেক্ষকরা। তাদের ভাষ্য, ধান-চালের বৈধ ও অবৈধ মজুতের সঠিক চিত্র খুঁজে বের করা গেলে বাজার সিন্ডিকেটের কারসাজি অনায়াসেই চিহ্নিত করা সম্ভব। অথচ বরাবরের মতো এবারও এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন উদাসীন রয়েছে। যা চালবাজ চক্রের বাজার অস্থিরতার ফন্দি কার্যকরে সহায়তা করছে।

যদিও বাজার সিন্ডিকেট এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দোষারোপ করে নিজেদের গা বাঁচানোর চেষ্টা করছে। ভরা মৌসুমেও চালের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে মিলাররা বলছেন, বড় বড় মিল মালিক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ধান কিনে মজুত করে রেখেছেন। এতে বাজারে সরবরাহ কম হওয়ায় বৃদ্ধি পেয়েছে ধানের দাম। তাই চালের দামও বেড়েছে। তাছাড়া বর্তমান আবহাওয়ার কারণে সূর্যের তাপ না থাকায় চাতাল মালিকরা চাল শুকাতে পারছেন না। এজন্যও দাম বাড়তে পারে।

ছোট ও মাঝারি মিলারদের ভাষ্য, দেশের বৃহত্তর রাইস মিল মালিকরা বোরো ধান বাজারে নামার সঙ্গে সঙ্গে শত শত ট্রাক ধান বাজার থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। ফলে বাজারে ধানের সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়াও অবৈধ মজুতদাররাও ধান মজুতের মাধ্যমে বাজারে ধানের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে। এর ফলে বাজারে চালের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে।

যদিও বড় মিলারদের অনেকেই এ অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, আড়তদারির নাম করে বিনা লাইসেন্সে কেউ কেউ হাজার হাজার মণ ধান স্টক করছে। সরকার মুখে নানা হুমকি দিলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে অবৈধ মজুত হু হু করে বাড়ছে। যা চালের বাজারকে অস্থিতিশীল করার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের চাল ব্যবসায়ী ও চালকল মালিক সমিতির নেতারা জানান, চট্টগ্রামে বড় কোনো চালকল নেই। এখানে যা আছে তার বেশির ভাগই ছোট ছোট চালকল। এসব চালকল চাল মজুত করে বাজারে প্রভাব ফেলার ক্ষমতা রাখে না। এখন চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে বড় করপোরেট হাউজগুলো। তারা চালকল মালিক বা মিলারদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ চাল কিনে নিচ্ছে। এরপর তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডের মোড়ক দিয়ে বাজারজাত করছে। পাশাপাশি এসব চাল বাজারে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করছে। একটি করপোরেট হাউজ একশ’ বা তারও বেশি চাল কলের সব চাল একসঙ্গে কিনে নিচ্ছে। দেশের চার-পাঁচটি করপোরেট হাউজ এভাবে সিংহভাগ চালকল থেকে একাই চাল কিনে নেওয়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পড়ছেন বিপাকে। করপোরেট হউজগুলোর সঙ্গে টিকতে পারছেন না তারা। এ কারণে চালের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো।

এদিকে শুধু বড় চালকল মালিক, মজুতদার ও করপোরেট হাউজগুলোর কারণেই ভর মৌসুমে চালের দাম বাড়ছে- এমনটা মানতে রাজি হন বাজার সংশ্লিষ্ট অনেকেই। তাদের ভাষ্য, এর নেপথ্যে সরকারের তথ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, মজুত পরিস্থিতির নাজুকতা, বাজার পর্যবেক্ষণের অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফলনে ভাটা, সঠিক সময়ে আমদানির সিদ্ধান্তে যেতে না পারার বিষয়গুলোও ভূমিকা রাখছে। এছাড়া মৌসুমি ও ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য এবং চাল ব্যবসায়ী ও চালকল মালিকদের মধ্যে গ্রম্নপিং ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।

তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৯৯৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সরকার কোনো বছরই খাদ্য মজুতে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। এ সুযোগ নিয়েছেন ওই বড় বড় ব্যবসায়ীরা। এছাড়া অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃষকের কাছ থেকে ধানও কিনছেন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। তারাই মূলত ঠিক করে দেন ধান চালের বাজারদর কী হবে, কত হবে।

মাঠ পর্যায়ের তথ্য বলছে, মজুতের জন্য খাদ্য অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্স নেওয়া অধিকাংশ বৈধ গুদামে নির্ধারিত পরিমাণের কয়েক গুণ বেশি ধান-চাল সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এছাড়া খাদ্য মজুতের জন্য সর্বোচ্চ যে সময় নির্ধারিত, সেটিও মানা হচ্ছে না। যা মজুতদারি আইনে অবৈধ। এ অপরাধে ফৌজদারি আইনে মামলা এবং জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে। অথচ প্রশাসনের দুর্বল নজরদারির সুযোগে মজুতকারী চক্র প্রায়ই লাখ লাখ টন ধান-চাল অবৈধভাবে মজুতের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজার অস্থিতিশীল করে তুলছে।

এছাড়া সারাদেশে বিপুল সংখ্যক অবৈধ মজুতদার রয়েছেন। তাদের গুদামে কী পরিমাণ ধান-চাল মজুত রয়েছে সে তথ্য দূরে থাক, এ ধরনের অবৈধ মজুতদারের সংখ্যা কত সে পরিসংখ্যানই নেই সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে। অবৈধ মজুতদারদের তালিকা তৈরির জন্য বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।

প্রসঙ্গত, গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীর খুচরা বাজারে বিক্রেতারা প্রতি কেজি মিনিকেট চাল ৬২ থেকে ৬৮ টাকা, নাজিরশাইল ৬৫ থেকে ৭৮ টাকা, বিআর-২৮ ও বিআর-২৯ চাল ৫৪ থেকে ৫৬ টাকায় বিক্রি করছেন। মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫৪ টাকা এবং মোটা হাইব্রিড চাল প্রতি কেজি ৪৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ কোরবানির ঈদের আগে এসব চাল খুচরা বাজারে দুই থেকে তিন টাকা কমে বিক্রি হয়েছে।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
topউপরে