ইছামতি পুনরুদ্ধারে বড় বাধা ১৭ অপরিকল্পিত সেতু
কাজ শুরুর দেড় বছর পর ১৩ সেতু রেখেই ডিপিপি সংশোধন, বাড়ছে প্রশ্ন

রাজিউর রহমান রুমী, পাবনা : প্রায় দুই দশক ধরে পরিকল্পনার পর শুরু হওয়া পাবনার ঐতিহাসিক ইছামতি নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প এখন নতুন বিতর্কের মুখে পড়েছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নৌ-চলাচল পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে গৃহীত প্রায় ১ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে নদীর ওপর নির্মিত ১৭টি অপরিকল্পিত সেতু। এর মধ্যে পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত ১৩টি সেতু ও কালভার্ট পুনর্নির্মাণের অংশ সম্প্রতি প্রকল্পের সংশোধিত ডিপিপি থেকে বাদ দেওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পাবনা শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ইছামতি নদী জেলার উত্তর-পূর্বে হুরাসাগর নদীর মাধ্যমে যমুনা এবং দক্ষিণে পদ্মা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত। একসময় এ নদী ছিল পাবনার অর্থনীতি, বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র। হোসিয়ারি, তাঁতপণ্যসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্য বড় জাহাজে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও বিদেশে পরিবহন করা হতো এই নদীপথে। চলাচল করত স্টিমার, কার্গো ও অন্যান্য নৌযান।
তবে দীর্ঘদিনের দখল, দূষণ ও ভরাটের ফলে নদীটি ক্রমেই সংকুচিত হয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। শহরাঞ্চলের বিভিন্ন অংশে নদীর দুই তীর দখল হয়ে যায়। কোথাও কোথাও ১৮০ থেকে ১৮৫ ফুট প্রশস্ত নদী সংকুচিত হয়ে প্রায় ১০০ ফুটে নেমে এসেছে।
নদী পুনরুদ্ধারের দাবিতে দীর্ঘদিন আন্দোলনের পর ২০০৩ সালে সমীক্ষা ও উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়নের কাজ শুরু হয়। কিন্তু সেই পরিকল্পনা চলমান থাকাকালেই নদীর ওপর একের পর এক নিচু ও অপরিকল্পিত সেতু নির্মাণ করা হয়।
তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০-এর দশক থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ইছামতি নদীর ওপর মোট ১৭টি সেতু নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সাতটি সেতু নির্মাণ করে। বাকি সেতুগুলোও বিভিন্ন সময়ে নির্মিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ সেতুতেই নৌ-চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্স রাখা হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, অনেক সেতুর নিচ দিয়ে বড় নৌযান তো দূরের কথা, ছোট নৌকাও স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারে না।
প্রকল্পের মূল ডিপিপি অনুমোদনের আগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞ দল সমীক্ষা চালিয়ে শহরাঞ্চলের ১৩টি সেতু ও কালভার্টকে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলে মূল প্রকল্পে এসব অবকাঠামো অপসারণ করে প্রয়োজনীয় উচ্চতার নতুন সেতু নির্মাণের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
পাবনা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম বলেন, “বর্তমান বাস্তবতায় সেতুগুলো অপরিকল্পিত বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। তবে এগুলো নির্মাণের সময় আমি দায়িত্বে ছিলাম না। সে সময় কী বিবেচনায় সেতুগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল, তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই ভালো বলতে পারবেন।”
পাবনার কৃতী সন্তান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের উদ্যোগে ২০২৩ সালের আগস্টে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ১ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকার ইছামতি নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প অনুমোদন পায়। ২০২৪ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরুর প্রায় দেড় বছর পর ডিপিপি সংশোধন করে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা ১৩টি সেতু ও কালভার্ট পুনর্নির্মাণের অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এতে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য কতটা অর্জিত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক সুধাংশু কুমার সরকার বলেন, “নকশা পরিবর্তনে প্রকল্পের খুব বেশি ক্ষতি হবে না।” তবে তিনি স্বীকার করেন, ইছামতি নদীর ওপর নির্মিত ১৭টি সেতুই অপরিকল্পিত। তিনি বলেন, “মাত্র ৩৫ কিলোমিটার নদীপথে প্রায় ৫০টি সেতু ও কালভার্ট রয়েছে, যা সত্যিই বিস্ময়কর।”
নদী বিশেষজ্ঞ, পরিবেশকর্মী, সচেতন নাগরিক ও নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতাদের মতে, পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা অবকাঠামো অপসারণ ছাড়া নদীর প্রকৃত পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, প্রকল্পের মূল নকশা থেকে সরে এলে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের পরও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না।
তাদের দাবি, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নৌ-চলাচল নিশ্চিত করতে বুয়েটের সুপারিশ অনুযায়ী ১৩টি প্রতিবন্ধক সেতু ও কালভার্ট অপসারণ করে আধুনিক ও প্রয়োজনীয় উচ্চতার নতুন সেতু নির্মাণ করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে আবারও ব্যয়বহুল সংস্কার কাজের প্রয়োজন হতে পারে এবং প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।




