“হজ্জে মুসলমানদের আরাফায় মিলন”

প্রকাশিত: এপ্রিল ৩, ২০২৫; সময়: ১:১৯ pm | 
খবর > মতামত

মামুনুর রহমান: আরবী ভাষায় ‘হজ্জ’ অর্থ যিয়ারতের সংকল্প করা। হজ্জ ইসলামী শরীয়াতের অন্যতম উৎস। ইসলামী শরীয়াতের পরিভাষায়, প্রত্যেক সামর্থবান নারী-পুরুষের শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত হচ্ছে এই হজ্জ। এটিকে ইসলামের পঞ্চম রোকন(স্তম্ভ) হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে।

হজ্জের ইতিহাস: হজ্জের ইতিহাস অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক এবং শিক্ষাপ্রদ। গভীর মনোযোগের সাথে সেই ইতিহাস অধ্যয়ন করলে হজ্জের কল্যাণকারীতা পাঠকের জন্য সুনিশ্চিত হবে। হযরত ইব্রাহিম (আ) ছিলেন মুসলিম জাতির পিতা এবং আল্লাহর খলিল বা বন্ধু। তাঁকে আল্লাহতায়ালা অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং বিভিন্ন ধরণের বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন। হযরত মূসা(আ), হযরত ঈসা(আ) এবং হযরত মুহাম্মদ(সা) – এই তিনজন নবীই হযরত ইব্রাহিম (আ) এর বংশজাত, তাঁর প্রজ্জলিত আলোকবর্তিকা থেকে সমগ্র দুনিয়ায় সত্যের জ্যোতি বিস্তার করেছেন।

হযরত ইব্রাহিম (আ) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল(আ) দুজনে মিলে মুসলমানদের বিশ্ববিখ্যাত কেন্দ্র খানায়ে কাবা প্রতিষ্ঠা করেন,যেটা ছিল মুসলিমদের সম্মেলেন কেন্দ্র। মুসলিম বিশ্বের এই সম্মেলনেরই নাম হজ্জ। মানুষের জন্য যে ঘর নির্দিষ্ট করা হয়েছিল, তা মক্কার ঘর-তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এটা অত্যন্ত পবিত্র, বরকতপূর্ণ এবং সারা দুনিয়ার জন্য হেদায়েতের কেন্দ্রস্থল। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন, ” মানুষের জন্য সর্বপ্রথম যে ঘর নির্দিষ্ট করা হয়েছিল তা মক্কার ঘর তাতে সন্দেহ নেই। এটা অত্যন্ত পবিত্র, বরকতপূর্ণ এবং সারা দুনিয়ার জন্য হেদায়েতের কেন্দ্রস্থল। এতে আল্লাহর প্রকাশ্য নিদর্শনসমূহ বর্তমান রয়েছে, ‘মাকামে ইব্রাহীম’ রয়েছে এবং যে-ই এখানে প্রবেশ করবে, সে-ই নিরাপদে থাকবে।”-(সুরা আলে ইমরান: ৯৬-৯৭)

এই কাবা ঘরকে কেন্দ্র করে এককালে এক আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত ও প্রচার শুরু হয়েছিল। এক আল্লাহর দাসত্ব করার জন্য কাবা ঘরের চতুর্দিকে তাওয়াফ করা হতো। কিন্তু আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগে এই কাবা ঘরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অশ্লীল নাচ-গান, মদ পান, ব্যভিচার ও নির্লজ্জ কাজ-কর্মের অনুষ্ঠান প্রচলিত ছিল। জাহেলী যুগে, পশু কুরবানী করে কুরবানীর রক্ত কাবা ঘরের দেয়ালে লেপে দিত এবং এর গোশত কাবার দুয়ারে ফেলে রাখতো।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন ও রাসুলুল্লাহ(স) বলেন যে, যেসব মুসলমানের কাবা পর্যন্ত যাবার আর্থিক সামর্থ্য আছে ও শারীরিক দিকে দিয়েও যারা অক্ষম নয়, তাদের মধ্যে একবার হজ্জ করা অবশ্যই কর্তব্য। হযরত মুহাম্মদ (স:)বলেন, “মানুষের ওপর আল্লাহর হক এই যে, এই কাবা ঘর পর্যন্ত আসার সামর্থ্য যাদের আছে তারা হজ্জ করার জন্য এখানে আসবে। যারা কুফুরী করবে(অর্থাৎ সামর্থ্য থাকা সত্বেও হজ্জে আসবে না), তারা জেনে রাখুক যে, আল্লাহ সৃষ্টিজগতের মুখাপেক্ষী নন। “-(সূরা আলে ইমরান : ৯৭)

পরবর্তীতে কুরবানী পশুর রক্ত খানায়ে কাবার দেয়ালে মর্দন করা এবং গোশত নিক্ষেপ করার কুপ্রথা বন্ধ হলো। আর পরিস্কার বলে দেওয়া হলো:

” এসব পশুর রক্ত বা গোশত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, তোমাদের তাকওয়া এবং পরহেযগারী আল্লাহর কাছে পৌঁছতে পারে।”-(সূরা আল হাজ্জ:৩৭)।

হজ্জে গিয়ে পবিত্র ও পরিস্কারভাবে তাওয়াফ করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ” হে নবী! আপনি বলে দিন যে, আল্লাহতায়ালা কখনও নির্লজ্জতার হুকুম দেন না।”- (সূরা আল-আরাফ :৩১)
“হে আদম সন্তান! সকল ইবাদতের সময় তোমাদের সৌন্দর্য গ্রহণ (পোশাক পরিধান) কর।”-(সূরা আল আরাফ:৩১)

হজ্জের বৈশিষ্ট্য: পবিত্র কুরআন মাজিদে হযরত ইব্রাহিম (আ)-কে হজ্জের জন্য সাধারণ দাওয়াত দেয়ার হুকুমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দুনিয়ার মানুষ সাধারণত দুই ধরণের ভ্রমণ করে করে থাকে। এক প্রকারের ভ্রমণ করা হয় রুযি রোযগারের জন্য, আর আরেক প্রকারের ভ্রমণ হয় আনন্দ-স্ফুর্তি, লাভ ও অবসর বিনোদনের উদ্দেশ্যে। যে ব্যক্তি এক দীর্ঘকালের জন্য নিজের ঘর বাড়ি আত্নীয়-স্বজনের সাথে কিছুটা সম্পর্ক ত্যাগ করে এবং নিজের কারবারে ক্ষতি, অর্থ ব্যয় ও সফরের কষ্ট স্বীকার করে হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হবে,তবে বুঝতে হবে সে ব্যক্তির মনে আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা আছে।

আল্লাহর ফরযকে সে ফর‍য মনে করে এবং মানসিকভাবে সে এতদূর প্রস্তুত যে, বাস্তবিকই যদি কখনো আল্লাহর পথে বের হওয়ার প্রয়োজন হয়, তখন সে অনায়াসে গৃহ ত্যাগ করতে পারবে। আর নিজের ধন-সম্পদ এবং আরাম-আয়েশ সবকিছু আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য কুরবান করতে পারবে। এ পবিত্র ইচ্ছা নিয়ে যখন সে হজ্জের সফরে যাবার জন্য তৈরি হয়,তখন তার স্বভাব প্রকৃতি সম্পূর্ণ আলাদা ধরণের হয়ে যায় এবং তার অন্তরে বাস্তবিকই আল্লাহর প্রেমের উদ্দীপনা স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে উঠে। বস্তুত সে সেই দিকের জন্য পাগল হয়ে উঠে এবং তার মনে তখন নেক ও পবিত্র ভাবধারা ছাড়া অন্য কিছুই জাগ্রত হতে পারে না।

অত:পর আরও একটি দিক লক্ষ্য না করলে হজ্জের কল্যাণ ও স্বার্থকতা পরিপূর্ণ হবে না। এক একজন মুসলমান কখনো একাকী হজ্জ করে না। দুনিয়ার সমগ্র মুসলমানদের জন্যই হজ্জ করার তারিখ নির্দিষ্ট করা হয়েছে। হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মুসলমান একত্রিত হয়ে একই সময়ে হজ্জ করে থাকেন। এ থেকে বুঝা যায়, একজন মুসলমান হজ্জ করলে তার উপর কতখানি প্রভাব পড়া সম্ভব। পরবর্তী প্রবন্ধে জানতে পারা যাবে যে, দুনিয়ার মুসলমানদের জন্য হজ্জের একটি সময় নির্দিষ্ট করে দিয়ে হজ্জের কল্যাণ কতগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।

হজ্জের বিশ্ব সম্মেলন: মুসলমানদের একটি বিশ্ব সম্মেলন হচ্ছে পবিত্র হজ্জ। হজ্জের মাধ্যমেই মুসলমানদের মাঝে এক বিরাট বিল্পব সুচিত হতে পারে। এর মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব তৈরি হয়। ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম হলে সাধারণত ধনী ও বিত্তশালীদের ধন-সম্পদ, দান-সদকা,যাকাত ইত্যাদি “বায়তুলমালে” জমা হবে এবং সুষ্ঠুভাবে প্রাপ্যদের নিকট বন্টনের সম্ভাবনা থাকবে। ফলে সমাজে অভাবগ্রস্ত লোকদের অপূর্ব কল্যাণ সাধিত হয়। দুনিয়ার মুসলমানকে একত্রিত হয়ে হজ্জ করার রীতি চালু করে দিয়ে সীমাহীন কল্যাণ লাভের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।

হজ্জের মাধ্যমেই বিশ্বের সকল মুসলমান আরাফার ময়দানে একত্রিত হবার সুযোগ পায়। সকলে প্রায় একই পোশাক পরিধান করে আল্লাহর বিভিন্ন হুকুম, হজ্জের বিভিন্ন নিয়ম-কানুন পালন করার সুযোগ লাভ করে। এ সময় সকলের কন্ঠে উচ্চারিত হয়-” লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লা-শারিকালাকা লাব্বাইক, ইল্লাল হামদা অন-নেয়ামাতা অনিল মূলক, লা শারিক আলা লাব্বাইক….” এ সময় লাব্বাইক লাব্বাইক ধ্বনিতে চারিদিক মুখরিত হয়ে উঠে এবং আল্লাহর সামনে হাজির হয়ে এক অদৃশ্য আকর্ষণে পথ চলতে থাকে।

সকলে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে দৌড়াতে থাকে, সকলে মিনায় উপস্থিত হয়ে ইমামের কন্ঠে ভাষণ ও খুতবা শ্রবণ করে এবং মুযদালিফায় এসে তাবুর নিচে রাত্রি যাপন করে। পরবর্তীতে আবার সকলে মিনার দিকে প্রত্যাবর্তন করে, কুরবানী করে, কাবায় ফিরে এসে তাওয়াফ করে, সকলেই কাবাকে সামনে রেখে নামায পড়ে- এসব কাজে যে পবিত্র পরিবেশ ও আধ্যাত্মিক মনোভাবের সৃষ্টি হয়, দুনিয়ার অন্য কোনো ধর্মে বা জীবন ব্যবস্থায় তার তুলনা নেই।

ইসলাম একটি পূর্নাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। ইসলাম দুনিয়ার মানুষকে একটি হেরেম দান করেছে। এই হেরেম কিয়ামত পর্যন্ত শান্তির কেন্দ্রস্থল। এখানে মানুষ মারা তো দূরের কথা, কোনো জন্তুও শিকার করা যেতে পারে না। ইসলাম পৃথিবীর বুকে একটি শহর প্রতিষ্ঠিত করেছে, যে শহরে কারো কোনো হাতিয়ার নিয়ে প্রবেশের অনুমতি নেই। সেই শহরটি হলো পবিত্র মক্কা শহর, যেখানে কাবা শরীফ স্থাপিত। বছরের চারটি মাস হজ্জ ও ওমরার কাজ সম্পাদনের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। ইসলাম কাবা যাতায়াতের এই চারটি মাস সমস্ত পথেই শান্তি অক্ষুন্ন রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এটি বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং শান্তি রক্ষার একটি স্থায়ী ব্যবস্থা।

হযরত মুহাম্মদ (স) ইরশাদ করেন, ” মক্কা নগরের যে স্থানে এসে যে ব্যক্তি প্রথমে অবতরণ করবে, সেই স্থান তারই হবেব।” এখানকার বাড়ি-ঘরের ভাড়া আদায় করা জায়েয নয়। হযরত উমর ফারুক (রা) এখানকার লোকদের ঘরের সম্মুখস্থ প্রাঙ্গনের দুয়ার বন্ধ করতে নিষেধ করেছিলেন, যাতে লোকেরা তাদের প্রাঙ্গনে এসে অবস্থান করতে পারে। এখানে অবস্থান করে তারা যেন হজ্জের যাবতীয় হুকুম আহকাম পালন করা যায়-সেই নির্দেশনার কথাও জানতে পারা যায়।
দুনিয়ার রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ইসলামের হাতে চলে আসলে হজ্জ ও ওমরার কারণে একটি বছরের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ সময় যুদ্ধ এবং রক্তারক্তির হাত থেকে দুনিয়া রক্ষা পেতে পারে। এদিক দিয়ে হজ্জের গুরুত্ব অপরিসীম।

কাজেই, আমাদের উচিত কুরআন ও হাদিসের আলোকে হজ্জের যাবতীয় হুকুম আহকাম মেনে জীবনে একটি বারের জন্য হলেও হাজ্জব্রত পালন করা। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে পবিত্র হাজ্জ পালন করার তৌফিক দান করুন-আমিন।

 

 

 

[লেখক: মো: মামুনুর রহমান, সহকারী শিক্ষক (আইসিটি), আইসিটি জেলা অ্যাম্বাসেডর
গুল-গোফুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়
গোদাগাড়ী, রাজশাহী ]

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন