বরেন্দ্র অঞ্চলে পানিসংকট: বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে

লেখা: অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান

প্রকাশিত: মে ৮, ২০২৬; সময়: ৪:১৮ pm | 
খবর > মতামত

বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানি নির্বিচার সেচের কাজে ব্যবহারের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। সেখান থেকে আর আগের জায়গায় আসছে না। এই অবস্থা হুট করে হয়নি। পানি উত্তোলনের ক্ষেত্রে সুশাসন বলতে আমরা যেটা বুঝে থাকি; তাতে একটা জবাবদিহি, একটা স্বচ্ছতা কিংবা দায়িত্ববোধ থাকে। সেটা এখানে অনুপস্থিত।

বরেন্দ্র অঞ্চলের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁয় সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০টি গভীর নলকূপ বসানোর নির্দেশনা ছিল। কিন্তু নির্দেশনা অমান্য করে অনেক বেশি গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। বাকি নলকূপগুলো কিন্তু ব্যক্তিমালিকানায় চলছে। রাজশাহীতে গভীর নলকূপের পরিত্যক্ত গর্তে একটা শিশু পড়ে কিছুদিন আগে মারা গেল। সেটা কিন্তু ব্যক্তিমালিকানাধীন ছিল। ব্যক্তিমালিকানায় যাঁরা করেন, তাঁদের দায়বদ্ধতা কম।

বাংলাদেশ পানি আইন এবং বিধিতে এই জায়গায় একটু ‘ব্যান ইম্পোজ’ (নিষেধাজ্ঞা) করা আছে। আমরা সব সময় দেখছি, বরেন্দ্র এলাকায় পানি উত্তোলন এবং পানি নিয়ে ব্যবসাটাও এলাকার যাঁরা সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি আছেন, তাঁরা নিজের মতো করে থাকেন। এখানে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের হাত অতটা শক্তিশালী নয়। কিন্তু তাদের জন্য যে আইনের বিধি রয়েছে, সেই মোতাবেক তারা কেউ চলছে না। তার ফলে এখানে একটা ‘ওয়াটার লর্ডশিপ’ তৈরি হয়েছে। এই লর্ডশিপটা পানিসংকটের চ্যালেঞ্জ। এখানে কেউ কোনো আইনকানুনের ধার ধারছে না। সেই বিষয়গুলো সম্পর্কে সতর্ক হতে হবে সরকারকে।

আজকে ওই ১১ থেকে ১২ হাজার গভীর নলকূপ যদি চলতে থাকত, তাহলে হুট করে এই সংকট হতো না। এ জন্য এখানে সরকারের আইনের প্রয়োগটা খুব সঠিকভাবে হতে হবে।

সুশাসনের পাশাপাশি আরেকটা বিষয় হচ্ছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের পানিসংকট মোকাবিলায় দ্রুত ভূগর্ভস্থ পানির বিকল্প উৎসের সন্ধান করতে হবে। এ জন্য খাঁড়ি (পানিপ্রবাহের খাল) ও পুকুরগুলো খনন-পুনঃখনন করে বৃষ্টির পানি ধারণ করার ব্যবস্থা করতে হবে। বরেন্দ্র অঞ্চল উঁচু। সেখান থেকে পানি নিচের দিকে চলে আসতে পারে। সে জন্য খাঁড়িতে ‘ক্রসডেম’ দিয়ে পানি ধরে রাখতে হবে।

বর্ষা মৌসুমে যে আমন ধান হয়, তখন খরাও হয়। যতটা সম্ভব এই খরা মোকাবিলা করতে হবে নদীর পানি দিয়ে। আর বোরো ধানের শুরুটা পুকুর ও খাঁড়ির পানি দিয়ে করতে হবে। তারপর সংকট অনুযায়ী ভূগর্ভস্থ পানি তুলতে হবে। কখনোই নির্বিচার ভূগর্ভস্থ পানি তোলা যাবে না।

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর যাতে আগের জায়গায় ফিরে আসে, সে জন্য বৃষ্টির পানি ফিল্টার করে মাটির নিচে পাঠাতে হবে। ভূ-উপরিস্থ পানির যত রকম রিসোর্স (উৎস) আছে, সব কটি কাজে লাগাতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে হবে, কোনোভাবেই যেন ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় না হয়।

লেখক- চৌধুরী সারওয়ার জাহান, অধ্যাপক, ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন