বিদায়ী সরকারের ‘অপছায়া’ ও বর্তমান সরকারের প্রশাসনিক সংকট

প্রকাশিত: জুন ১৯, ২০২৬; সময়: ৩:০২ pm | 
খবর > বিশেষ সংবাদ

পদ্মাটাইমস ডেস্ক: তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের চার মাস পূর্ণ হয়েছে। স্বল্প এই সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি বেশ কিছু ইতিবাচক ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছেন।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সাধারণ মানুষের মনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে- প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা ও সংস্কারমূলক উদ্যোগগুলো মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে কারা? সরকারের ভেতরেই কি এমন কোনো প্রভাবশালী মহল রয়েছে, যারা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তে পুরোনো প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী?

গত মঙ্গলবার বিএনপি বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমাদের প্রতিহিংসার মানসিকতা বদলাতে হবে। আমার সঙ্গে যা হয়েছে, প্রতিশোধ নিলেও তা ফেরত পাব না। তাই প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে দেশের জন্য কী করা যায়, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে।”

প্রধানমন্ত্রীর এই উদার ও দূরদর্শী বার্তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এখনো সেই প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

মব জাস্টিস ও আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ

সরকারের কঠোর অবস্থানের পরও মব সহিংসতা ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে মব হামলায় অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন, যা গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এপ্রিল মাসে এ সংখ্যা ছিল ২১।

একই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর নতুন মামলায় পুনরায় গ্রেপ্তার এবং হয়রানির অভিযোগও সামনে আসছে। এসব ঘটনা আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় নাঈম হাসানকে পুলিশের হেনস্তার সাম্প্রতিক ঘটনাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণ নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

অর্থনীতির সামনে আস্থার সংকট

দীর্ঘ দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনামলে দেশের বেসরকারি খাত বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হামলা, অগ্নিসংযোগ, ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং ব্যবসায়ীদের সামাজিকভাবে হেয় করার ঘটনায় উদ্যোক্তাদের আস্থা নষ্ট হয়েছে।

বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী একজন উদ্যোক্তা হওয়ায় তিনি নতুন বাজেটে বন্ধ কারখানা চালুর জন্য আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। তবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য শুধু অর্থ সহায়তা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিরাপদ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ।

দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের আশ্বাস দিলেও এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। একইভাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি হওয়া অনেক ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং বিদেশ ভ্রমণসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞাও পুরোপুরি প্রত্যাহার হয়নি।

ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢালাওভাবে ব্যবসায়ীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা দেশের অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক বার্তা বহন করে না।

প্রশাসনে অতীতের ছায়া

বিএনপির অনেক নেতাই মনে করছেন, বিদায়ী সরকারের রেখে যাওয়া প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে বর্তমান সরকারের সংস্কার কার্যক্রম সফল করা কঠিন। মাঠ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচার বিভাগ এবং কূটনৈতিক অঙ্গনে এখনো বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি।

সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সময়ে নিয়োগ পাওয়া অনেক আইন কর্মকর্তা, বিচারক ও কূটনীতিক এখনো দায়িত্বে রয়েছেন। সরকারের অভ্যন্তরে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের একটি অংশ বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করছেন না।

অন্যদিকে, দলীয় চাটুকারিতা ও তেলবাজির সংস্কৃতিও আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। যোগ্যতা ও দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা প্রশাসনের জন্য উদ্বেগজনক। এমনকি অতীতে দলের বিরোধিতা করা ব্যক্তিরাও নতুন পরিচয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে

প্রত্যেক সরকারের মতো সরকারের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ বা প্রাথমিক স্বস্তির সময় শেষ। গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ শান্তি, স্থিতিশীলতা, বৈষম্যহীনতা ও সুশাসনের প্রত্যাশায় বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। জনগণ আর সংঘাত, প্রতিশোধ ও অরাজকতার রাজনীতি দেখতে চায় না।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হলে প্রশাসনে মেধাবী, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তিদের জায়গা করে দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনের ভেতরে থাকা অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা এবং পুরোনো সংস্কৃতির প্রভাব দ্রুত দূর করা জরুরি।

কথা ও কাজের মধ্যে ফারাক তৈরি হলে জনগণের আস্থা দ্রুত ক্ষয় হতে পারে। তাই এখনই বাস্তবতা মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের উপযুক্ত সময়।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন