৬ টাকার ডিম ক্রেতা কিনছে ১১ টাকায়

পদ্মাটাইমস ডেস্ক: উৎপাদন খরচ প্রায় সাড়ে ৯ টাকা হলেও প্রান্তিক খামারিরা প্রতি পিস ডিম খামার পর্যায়ে বিক্রি করছেন মাত্র সাড়ে ৬ টাকায়। কিন্তু সেই ডিম আড়ত হয়ে খুচরা বাজারে সাধারণ ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে প্রায় ১১ টাকায়। ফলে একদিকে খামারিরা লোকসানের মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে বেশি দামে ডিম কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ক্রেতারা।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠানের দৌরাত্ম্যের কারণে বাজারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে লোকসান গুনতে গুনতে অনেক প্রান্তিক খামার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তারা আশঙ্কা করছেন, ছোট খামারগুলো বন্ধ হয়ে গেলে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে ডিম ও মুরগির কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে ভোক্তারা।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দৈনিক পণ্যমূল্যের তালিকা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি হালি ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ৩৬ থেকে ৪০ টাকায়। আগের দিন একই ডিম বিক্রি হয়েছে ৩২ থেকে ৪০ টাকায়। এছাড়া বাজার ঘুরে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২৩০ টাকায়, যা এক দিন আগে ছিল ২২০ টাকা। এক সপ্তাহ আগে এর দাম ছিল ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা এবং এক মাস আগে ছিল ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা।
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার প্রান্তিক খামারি খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম জানান, তিনি সোমবার প্রতি পিস ডিম বিক্রি করেছেন সাড়ে ৬ টাকায়, অথচ প্রতিটি ডিম উৎপাদনে তার খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৯ টাকা। চার মাস ধরে তিনি লোকসান দিয়ে ডিম বিক্রি করছেন। এখন আর এই ক্ষতি বহন করার মতো সামর্থ্য নেই বলেও জানান তিনি।
একই এলাকার আরেক খামারি আব্দুল মালেক বলেন, তার খামারে প্রতিদিন ৪০ হাজার টাকার বেশি লোকসান হচ্ছে। মাসে এই লোকসানের পরিমাণ চার লাখ টাকারও বেশি। তিন মাস ধরে তিনি বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে পারেননি। ডিম বিক্রি করে মুরগির খাবারের খরচও উঠছে না।
খামারি আলম হোসেন জানান, তার খামারে এখনো প্রায় ২০ হাজার মুরগি রয়েছে। বাজারে ডিমের দাম ৬ টাকার নিচে থাকায় দেড় মাসে প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার যদি ডিমের দাম নির্ধারণ না করে, তাহলে এই খাত ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, দুই দশকের বেশি সময় ধরে প্রান্তিক খামারিদের পরিশ্রমের কারণে দেশের মানুষ তুলনামূলক কম দামে ডিম ও মুরগি খেতে পেরেছে। অথচ বর্তমানে তারাই সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছেন। তিনি বলেন, প্রান্তিক খামারিরা ঝরে পড়লে পুরো শিল্প কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাবে এবং তখন বাজারে তাদের নির্ধারিত দামেই ভোক্তাদের ডিম ও মুরগি কিনতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পোলট্রি খামারিদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কৃষক কার্ড দিতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুতে ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ এবং অন্যান্য সরকারি সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে আড়ত ও বাজারে আলাদা বিক্রয়কেন্দ্র তৈরিরও প্রয়োজন রয়েছে।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, পোলট্রি খাত গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। বাজার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য নির্ধারণ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো না গেলে ছোট খামারিরা দ্রুত ঝরে পড়বে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, আগের তুলনায় দেশে পোলট্রি খামারের সংখ্যা কমেছে। তবে এই খাত নিয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। দেশে মোট কতটি পোলট্রি খামার রয়েছে এবং এ খাতে কত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, তার নির্ভুল তথ্যও পাওয়া যায় না। সম্প্রতি অনুমোদিত পোলট্রি উন্নয়ন নীতিমালা এই খাতের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে বাজারে ভোজ্যতেলসহ কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়েছে। টিসিবি সূত্রে জানা গেছে, খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৮৫ থেকে ১৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা সাত দিন আগে ছিল ১৭৫ থেকে ১৮৫ টাকা। বোতলজাত দুই লিটারের সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৩৯০ থেকে ৩৯৫ টাকায়। পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৯৫০ থেকে ৯৫৫ টাকায়। এছাড়া প্রতি কেজি জিরা বিক্রি হচ্ছে ৬৪০ টাকায়, যা আগে ছিল ৬০০ টাকা। প্রতি কেজি লবঙ্গের দাম বেড়ে হয়েছে ১৪০০ টাকা, যা আগে ছিল ১২০০ টাকা।




