রাজশাহী অঞ্চলের ধানের বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা
বাম্পার ফলনেও লোকসানে কৃষক, কম দামে ধান কিনছে এজেন্টরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে চলতি মৌসুমে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে মিলছে না প্রত্যাশিত দাম। ফলে বিঘাপ্রতি দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। কৃষকদের অভিযোগ, বড় কোম্পানির এজেন্টদের সিন্ডিকেটের কারণে ধানের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
কৃষক ও কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এবার প্রতি বিঘা বোরো আবাদে খরচ হয়েছে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা। ধান কাটা, মাড়াই ও ঘরে তুলতে আরও ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। সব মিলিয়ে বিঘাপ্রতি মোট খরচ দাঁড়িয়েছে ২৬ থেকে ২৭ হাজার টাকা। অন্যদিকে বিঘাপ্রতি ফলন হয়েছে ২০ থেকে ২২ মন। বর্তমান বাজারে প্রতি মন ধান বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ১২০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা দরে। এতে কৃষকের আয় হচ্ছে ২৪ হাজার ৫০০ থেকে ২৫ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ বিঘাপ্রতি লোকসান হচ্ছে অন্তত দুই হাজার টাকা।
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কামারপাড়ার কৃষক জয়নাল আবেদিন জানান, তিনি সাড়ে তিন বিঘা জমিতে উফশী জাতের বোরো চাষ করেছিলেন। জমি তৈরি, বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে তার খরচ হয়েছে ৭৮ হাজার টাকা। পরে ধান কাটা ও মাড়াইয়ে আরও ২৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। সব মিলিয়ে খরচ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩ হাজার টাকা। কিন্তু ৭৩ মন ধান বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করে তিনি পাচ্ছেন মাত্র ৯১ হাজার ২৫০ টাকা। এতে তার লোকসান হয়েছে প্রায় ১২ হাজার টাকা।
এলাকার আরেক কৃষক মহিউদ্দিন শেখের অভিযোগ, উত্তরাঞ্চলের বড় বড় মোকামগুলোতে কয়েকটি কোম্পানির এজেন্ট সিন্ডিকেট করে ধানের দাম নির্ধারণ করছে। প্রতি হাটবারে তারা নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে দাম ঠিক করে দেয়। বাধ্য হয়ে কৃষকদের সেই দামেই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।
নওগাঁর মান্দা উপজেলার কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আগে এ অঞ্চলে অসংখ্য চাতাল ছিল। চাতাল মালিকরা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনতেন। কিন্তু বড় কোম্পানির দাপটে ছোট ছোট চাতালগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এখন কৃষকরা বড় কোম্পানির এজেন্টদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, উৎপাদন খরচ বেড়েছে কয়েকগুণ, কিন্তু ধানের দাম বাড়েনি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার কৃষক আব্দুল খালেক জানান, ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি সার ও কৃষি উপকরণের দামও বেশি। অথচ তিনি স্থানীয় হাটে ধান বিক্রি করেছেন মাত্র ১ হাজার ১২০ টাকা মন দরে।
কেশরহাটের কৃষক নুর ইসলাম বলেন, ধানের বাজারে কৃষকের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ধান ওঠার মৌসুমে দাম কমিয়ে দেওয়া হয়। মধ্যস্বত্বভোগীরা কম দামে ধান কিনে মজুত করে রাখে। পরে কয়েক মাস পর বেশি দামে বিক্রি করে লাভ করে তারা।
এদিকে গত ১৫ মে থেকে রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের সরকারি খাদ্য গুদামগুলোতে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে। খাদ্য বিভাগ প্রতি কেজি ধান ৩৬ টাকা বা প্রতি মন ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে কিনছে, যা বাজারদরের চেয়ে প্রায় ৩০০ টাকা বেশি। তবে কৃষকদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ কৃষকরা সহজে সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে পারছেন না।
তবে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক সাইফুদ্দিন বলেন, সরকার সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকেই ধান কিনতে চায়। কিন্তু প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে অনেক কৃষক গুদামে আসতে আগ্রহী নন।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ ড. আব্দুল মজিদ জানান, হাওড় অঞ্চলে উৎপাদনে কিছুটা ক্ষতি হলেও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। উৎপাদন খরচ কিছুটা বাড়লেও সরকারের সংগ্রহ কার্যক্রম জোরদার হলে বাজারে ধানের দাম বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।




