বাংলাদেশ সীমান্ত নিয়ে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘নীলনকশা’

এনডিটিভির প্রতিবেদন

প্রকাশিত: মে ৩১, ২০২৬; সময়: ৫:৩৮ pm | 
খবর > আন্তর্জাতিক

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার গঠনের পর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশ, অবৈধ অভিবাসন, চোরাচালান এবং কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ—দীর্ঘদিনের এসব আলোচিত বিষয় এবার প্রশাসনিক পর্যায়ে আরও গুরুত্ব পাচ্ছে বলে ভারতীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বাস্তবভিত্তিক ও ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তার মতে, কেবল রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, আইনগতভাবে টেকসই, কূটনৈতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণই হতে পারে স্থায়ী সমাধানের পথ।

ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সীমান্তরক্ষা বাহিনী (বিএসএফ) ইতোমধ্যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জোরদারে একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এবার মূল গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কথিত অনুপ্রবেশকারীদের যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে শনাক্তকরণে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, যাচাই ছাড়া কাউকে সীমান্তে ফেরত পাঠানোর পরিবর্তে নথিভুক্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

সূত্রগুলো বলছে, অতীতে সমন্বয়হীন ‘পুশব্যাক’ কার্যক্রম নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। তাই এবার বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

সীমান্ত বাস্তবতা ও নতুন পরিকল্পনা

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ অংশটি ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত জটিল। নদী, চরাঞ্চল, ঘনবসতিপূর্ণ গ্রাম, কৃষিজমি ও বনাঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত এই সীমান্তের অনেক অংশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এখনও অসম্পূর্ণ।

ভারতীয় সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ২১৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬৪৮ কিলোমিটারে কাঁটাতারের বেড়া নির্মিত হয়েছে। এখনও প্রায় ৫৬৯ কিলোমিটার সীমান্ত বেড়াহীন রয়েছে।

নতুন উদ্যোগের অংশ হিসেবে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, নতুন বর্ডার আউটপোস্ট (বিওপি) স্থাপন এবং বিএসএফের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য জমি অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে নতুন করে বেড়া নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

ভারতীয় প্রশাসনের আলোচনায় বর্তমানে একটি নতুন কৌশল গুরুত্ব পাচ্ছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’। এই পরিকল্পনার আওতায় স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও বিএসএফ যৌথভাবে সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্তকরণে কাজ করবে।

বিশেষ করে মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর ২৪ পরগনার মতো সীমান্তবর্তী জেলাগুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

বড় বাধা ‘১৫০ গজের নিয়ম’

তবে সীমান্তে পূর্ণাঙ্গ বেড়া নির্মাণের পথে বেশ কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সংক্রান্ত ‘১৫০ গজের নিয়ম’। এই ব্যবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক সীমান্তের খুব কাছাকাছি স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

এ ছাড়া জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ, পরিবেশগত জটিলতা, নদীভাঙন ও দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণেও অনেক এলাকায় কাজ ধীরগতিতে এগোচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তের একটি বড় অংশ নদী ও জলাভূমি হওয়ায় প্রচলিত কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ সব জায়গায় সম্ভব নয়। এ কারণে ভারত এখন প্রযুক্তিনির্ভর ‘স্মার্ট ফেন্সিং’ ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। এতে ক্যামেরা, থার্মাল সেন্সর, ড্রোন, রাডার ও লেজারভিত্তিক নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।

কূটনীতি ও বাস্তবতার সমন্বয়

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি মানবিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। ফলে কেবল কঠোর অবস্থান নয়, দুই দেশের মধ্যে সমন্বয় ও পারস্পরিক বোঝাপড়াও গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতীয় প্রশাসনের ভেতরের সূত্রগুলোও স্বীকার করছে, সীমান্তে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। যদিও নতুন উদ্যোগে কাজের গতি বেড়েছে, তবে আইনি, ভৌগোলিক ও কূটনৈতিক নানা জটিলতার কারণে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও সময় লাগতে পারে।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন