ডিজিটাল যুগে শিশু সুরক্ষায় কঠোর আইন চায় বিশেষজ্ঞরা

প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২৬; সময়: ৬:০৭ pm | 
খবর > তথ্য-প্রযুক্তি

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : দেশে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামকেন্দ্রিক অতিরিক্ত স্ক্রিননির্ভরতা তাদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তাই শিশুদের সুরক্ষায় বয়সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ও কঠোর আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।

২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৪ শতাংশ। এর মধ্যে বড় একটি অংশ তরুণ ও কিশোর বয়সী।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব বলেন, ইন্টারনেট আসক্তি মাদকাসক্তির মতোই মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে। এতে শিশুদের স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে ঘুমের সমস্যা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং পারিবারিক সম্পর্কের অবনতিও দেখা দেয়।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তরুণদের চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীল বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ কারণে দ্রুত কার্যকর নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

বিভিন্ন গবেষণায়ও একই ধরনের উদ্বেগ উঠে এসেছে। ‘নেচার অ্যান্ড সায়েন্স অব স্লিপ’ জার্নালের এক গবেষণায় সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমের মান হ্রাসের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অন্যদিকে আইসিডিডিআরবি’র গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা স্ক্রিনে সময় ব্যয় করে, যা চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা, স্থূলতা ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের নিচে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আইন করেছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, নরওয়ে, স্পেন, ডেনমার্কসহ আরও কয়েকটি দেশ বয়সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। চীনও নাবালকদের জন্য নির্দিষ্ট স্ক্রিন টাইম ও অনলাইন ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

বাংলাদেশে এখনো শিশুদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা বা কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। ইউনিসেফের জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৪৫ শতাংশ তরুণ কোনো না কোনো সময়ে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির মনে করেন, শুধু আইন করলেই হবে না; অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশুদের জন্য খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে। সমাজবিজ্ঞানী ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, অল্প বয়সে স্মার্টফোন ও উচ্চগতির ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা শিশুদের স্বাভাবিক সামাজিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে- ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে বয়সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, বাধ্যতামূলক বয়স যাচাই ব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা, অভিভাবক সচেতনতা কর্মসূচি এবং শিশু সুরক্ষায় বিদ্যমান আইন হালনাগাদ করা।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশেও শিশুদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার বিষয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ডিজিটাল আসক্তি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় সামাজিক ও মানসিক সংকটে পরিণত হতে পারে।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন