চোর ঢুকল কোন পথে? তা নিয়েই রহস্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীর সাহেববাজার স্বর্ণপট্টিতে একটি জুয়েলারি দোকানে সংঘটিত বড় ধরনের চুরির ঘটনায় চোরের প্রবেশপথ নিয়েই তৈরি হয়েছে রহস্য। দুই দোকানের মাঝের দেয়াল কেটে চুরির ঘটনা ঘটলেও উভয় দোকানের শাটার ও তালা অক্ষত থাকায় তদন্তে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
চুরির শিকার হয়েছে স্বর্ণপট্টির কারুশ্রী জুয়েলার্স। দোকানটির পাশেই অবস্থিত আফিয়া জুয়েলার্স। দুই দোকানের মালিকের বক্তব্যে মিল না থাকায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে।
কারুশ্রী জুয়েলার্সের মালিকদের দাবি, পাশের দোকানের দিক থেকে দেয়াল কেটে চোরেরা তাদের দোকানে প্রবেশ করে। অন্যদিকে আফিয়া জুয়েলার্সের মালিকের বক্তব্য, চুরির ঘটনা ঘটার পর কারুশ্রী জুয়েলার্স থেকেই দেয়াল কেটে তাঁর দোকানের দিকে আসা হয়ে থাকতে পারে।
দুই দোকানেরই তালা অক্ষত থাকায় এখনো নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বোয়ালিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদ কবির বলেন, “দুই দোকানের মালিকের সঙ্গেই কথা বলা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে কাউকেই সন্দেহের বাইরে রাখা হচ্ছে না। আমরা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যাচাই করছি। আশা করছি দ্রুতই রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে।”
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শনিবার ভোরের মধ্যে কোনো এক সময়ে চুরির ঘটনাটি ঘটে। প্রায় দুই দশক ধরে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন কারুশ্রী জুয়েলার্সের মালিক তূর্য সরকার ও তাঁর ভাই ইমন সরকার।
তাদের দাবি, দোকান থেকে প্রায় ২০০ ভরি স্বর্ণালংকার, ১ হাজার ২০০ ভরি রুপার অলংকার এবং ২০ লাখ টাকা নগদ চুরি হয়েছে। চুরি হওয়া স্বর্ণালংকারের বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা।
কারুশ্রী জুয়েলার্স একটি তিনতলা ভবনের নিচতলায় অবস্থিত। ভবনের নিচতলার সব কটি দোকানই জুয়েলার্সের। ওপরের দুই তলায় রয়েছে একটি আবাসিক হোটেল। কারুশ্রীর পাশেই আফিয়া জুয়েলার্স এবং তার পাশ দিয়েই হোটেলে ওঠার সিঁড়ির পথ। সেখানে একটি গেট থাকলেও হোটেলের যাতায়াতের কারণে সেটি সাধারণত খোলা থাকে।
শনিবার সকালে দোকান খুলতে এসে তূর্য সরকারের চাচাতো ভাই মো. শুভ প্রথমে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন। শাটার খুলে ভেতরে ঢুকেই তিনি দেখতে পান দোকানের মালামাল এলোমেলো অবস্থায় পড়ে আছে এবং সিন্দুক ভেঙে স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কারুশ্রী ও আফিয়া জুয়েলার্সের মাঝের দেয়ালের একটি অংশ কাটা দেখতে পাওয়া যায়।
খবর পেয়ে তূর্য সরকার ঘটনাস্থলে এসে আফিয়া জুয়েলার্সের মালিক খন্দকার আরিফুর রহমানকে ফোন করেন। তিনি এসে দেখেন, তাঁর দোকানের শাটার ও তালা সম্পূর্ণ অক্ষত। চাবি দিয়ে তালা খুলে ভেতরে প্রবেশের পর দেয়াল কাটা থাকলেও তাঁর দোকানের সিন্দুক অক্ষত পাওয়া যায়। সেখানে থাকা প্রায় দেড় লাখ টাকার অলংকারও নিরাপদ ছিল।
খন্দকার আরিফুর রহমান বলেন, “আমার দোকান দিয়ে চোর ঢুকলে শাটারের তালা ভাঙা থাকার কথা। কিন্তু তালা অক্ষত ছিল। এমনও হতে পারে, কারুশ্রীতে চুরির পর চোর দেয়াল কেটে আমার দোকানের দিকে এসেছে। রহস্যের সমাধান তদন্তেই বের হবে।”
এদিকে ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার স্বর্ণপট্টির সব জুয়েলারি দোকান বন্ধ রাখেন ব্যবসায়ীরা। তারা বিক্ষোভ মিছিলও করেন। দুপুরে কারুশ্রী জুয়েলার্সের সামনে ব্যবসায়ীদের অবস্থান করতে দেখা যায়।
কারুশ্রীর মালিক ইমন সরকার বলেন, “আমাদের সব স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ দোকানেই রাখা ছিল। চোরেরা শুধু মালামাল নয়, সিসিটিভি ক্যামেরার ডিভিআরও নিয়ে গেছে।” তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনার ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পার হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।
চুরির ঘটনায় শুক্রবার রাতে তূর্য সরকার বাদী হয়ে বোয়ালিয়া থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপকমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, পুলিশের পাশাপাশি সরকারের আরও কয়েকটি সংস্থা ঘটনাটি নিয়ে কাজ করছে। ইতোমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। সেগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। নিশ্চিত হওয়ার পর বিস্তারিত জানানো হবে।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি আশরাফুল ইসলাম বলেন, চুরির ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও চুরি হওয়া অলংকার উদ্ধারে ব্যবসায়ীদের দেওয়া ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম শেষ হয়েছে। তবে পুলিশ কমিশনার দ্রুত অগ্রগতির আশ্বাস দিয়েছেন। র্যাবসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণে ব্যবসায়ীরা বৈঠকে বসবেন।




