রাজশাহীতে মধ্যরাতে ঘটে গেল নাটকীয় ঘটনা

ডিবির অভিযান দেখে পাশের ছাদে লাফ দিয়ে পা ভাঙল স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা।

প্রকাশিত: জুন ২৮, ২০২৬; সময়: ৩:০৬ pm | 
খবর > বিশেষ সংবাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহী মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক ও হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মীর তারেককে ঘিরে শনিবার রাতে নগরে ঘটে নাটকীয় ঘটনা। ডিবি পুলিশের অভিযানের খবর পেয়ে একটি ভবনের ছাদ থেকে পাশের ভবনের ছাদে লাফ দেন তিনি। এতে তার ডান পা ভেঙে যায়। কয়েক ঘণ্টার উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পর মধ্যরাতে নেতাকর্মীরা তাকে ও আরেক আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে নগরের বোয়ালিয়া থানার নিউমার্কেট এলাকায় জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আসাসের বাসায় অবস্থান করছিলেন মীর তারেক। এ সময় রাজশাহী মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যরা ছয়তলা ভবনটি ঘিরে ফেলেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে আসাসের বাসার ছাদ থেকে পাশের ভবনের ছাদে লাফ দেন মীর তারেক। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। তার সঙ্গে থাকা আরেকজনও আহত হন।

ঘটনার পরপরই নিজের ফেসবুক আইডিতে দুটি স্ট্যাটাস দিয়ে মীর তারেক দাবি করেন, ডিবি পুলিশ তাকে ঘিরে ফেলেছে। তিনি নেতাকর্মীদের ঘটনাস্থলে আসার আহ্বান জানান। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ভবনের সামনে জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় ছাদে অবস্থান করেই তিনি ফেসবুক লাইভ করেন।

লাইভে মীর তারেক বলেন, তদন্ত ছাড়াই তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, পুলিশ ডাকলে তিনি নিজেই হাজির হতেন; এভাবে অভিযান চালানোর প্রয়োজন ছিল না।

রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ডিবির পাশাপাশি থানা পুলিশের সদস্যরাও সেখানে অবস্থান করছেন। ভবনের সামনে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ ও স্লোগান দিচ্ছেন। পরে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) ক্রাইসিস রেসপন্স টিম (সিআরটি) লাঠিসোঁটা নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছালে এলাকায় কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তবে রাত ১২টা ৫৫ মিনিটের দিকে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। পুলিশ ধীরে ধীরে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পুলিশ চলে যাওয়ার পর নেতাকর্মীদের একটি অংশও সেখান থেকে সরে যান।

রাত ১টা ১২ মিনিটের দিকে প্রায় ১০০ মোটরসাইকেলের একটি বহর ঘটনাস্থলে আসে। এরপর আহত মীর তারেককে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়। কিন্তু যে ভবনের ছাদে তিনি পড়ে ছিলেন, সেই ভবনের কলাপসিবল গেটের চাবি না পাওয়ায় হাতুড়ি ও শাবল দিয়ে তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন নেতাকর্মীরা।

এ সময় ভবনের নিচতলার সিসিটিভি ক্যামেরার দৃশ্য আড়াল করার চেষ্টাও দেখা যায়। একটি ক্যামেরার সামনে কাপড় গুঁজে দেওয়া হয়, অন্যটির সামনে হেলমেট ধরা হয়। পরে একটি ক্যামেরার মুখ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।

উদ্ধার অভিযানের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের ছবি ও ভিডিও ধারণে বাধা দেওয়া হয়। কয়েকজন নেতাকর্মী সাংবাদিকদের ক্যামেরা ব্যবহার না করার অনুরোধ করেন। কেউ কেউ হুমকি দেন এবং অশালীন আচরণও করেন।

রাত ১টা ৩৯ মিনিটের দিকে দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে হেলমেট পরা অবস্থায় প্রথমে এক আহত ব্যক্তিকে নিচে নামানো হয়। পরে একইভাবে বের করে আনা হয় মীর তারেককে। তাকে মোটরসাইকেলে তুলে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। তার সঙ্গে আহত অপর ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এর আগে গত ২১ জুন নগরের শাহমখদুম থানার ছায়ানীড় আবাসিক এলাকায় মীর তারেকের ভাড়া বাসায় গুলিবিদ্ধ হন ফয়সাল বাঁধন (৩০) নামে এক যুবক। ওই ঘটনায় পুলিশ একটি অবৈধ পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, গুলির খোসা, ককটেল ও বিস্ফোরক উদ্ধারের দাবি করে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা দায়ের করে।

ঘটনার সময় ফেসবুক লাইভে ছাত্রদল নেতা আসাস দাবি করেন, উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও বিস্ফোরক সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না। এসব বিষয়ে গুলিবিদ্ধ ফয়সাল বাঁধনই ব্যাখ্যা দিতে পারবেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই লাইভে মীর তারেকও বিস্ফোরক উদ্ধারের দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। আসাসের ভাষ্য, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেই তার কাছে অস্ত্র ও বিস্ফোরকের বিষয়ে জানতে চায়।

শুধু সাম্প্রতিক অস্ত্র ও বিস্ফোরকের ঘটনায় নয়, একটি হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবেও আলোচনায় রয়েছেন মীর তারেক। গত বছরের ৭ মার্চ নগরের দড়িখড়বোনা এলাকায় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে ছুরিকাঘাতে নিহত হন রিকশাচালক গোলাম হোসেন। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী পরিবানু বেগম বাদী হয়ে ছয়জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। সেই মামলার অন্যতম এজাহারভুক্ত আসামি মীর তারেক।

থানা সূত্রে জানা গেছে, ওই মামলার কোনো আসামিকেই এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তারা কেউ আদালতেও আত্মসমর্পণ করেননি। ফলে পুলিশের নথিতে সবাই এখনও পলাতক।

তবে শনিবার রাতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও মীর তারেককে গ্রেপ্তার না করায় প্রশ্ন উঠেছে। একই হত্যা মামলার আরেক এজাহারভুক্ত আসামি ও শাহমখদুম থানা বিএনপির আহ্বায়ক সুমন সরদারও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। আহত মীর তারেককে মোটরসাইকেলে করে সরিয়ে নেওয়ার সময়ও তাকে সেখানে দেখা যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আরএমপির মুখপাত্র অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, “পুলিশ মীর তারেককে গ্রেপ্তার করতে যায়নি। অন্য এক আসামিকে ধরতে সেখানে অভিযান চালানো হয়েছিল। ওই আসামিকে না পেয়ে এবং বিষয়টি ভুল বোঝাবুঝি বলে নিশ্চিত হয়ে পুলিশ ফিরে আসে।”

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন