চার মাদক মামলার আসামি শাহীন, গরুর রাখাল থেকে কোটিপতি
স্থানীয় যুবদলের পদধারী এই নেতার বিরুদ্ধে বিপুল সম্পদ অর্জন, মাদক সিন্ডিকেট ও হুন্ডি কারবারে সম্পৃক্ততার অভিযোগ; প্রশাসনের দাবি, চলছে তথ্য সংগ্রহ ও অভিযান

নিজস্ব প্রতিবেদক: সারাদেশে চলমান মাদকবিরোধী বিশেষ সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যে রাজশাহীর সীমান্তবর্তী গোদাগাড়ী উপজেলায় আবারও আলোচনায় এসেছে কথিত মাদক কারবার, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের বিষয়টি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে মাদক উদ্ধার ও গ্রেপ্তার হলেও অভিযোগ রয়েছে, বড় পর্যায়ের কারবারিদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরেই আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
সম্প্রতি গোদাগাড়ী উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক কমিউনিটি পুলিশিং সভায় মাদক সংশ্লিষ্ট অভিযোগে আলোচিত কয়েকজন ব্যক্তির উপস্থিতির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে রাজশাহী রেঞ্জের পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ শাহজাহান কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনার কথা জানান।
এমন প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়নের মাটিকাটা ভাটা গ্রামের বাসিন্দা শাহীন আলীর নাম। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, বর্তমানে তিনি মাটিকাটা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন।
চারটি মাদক মামলা, দুইবার কারাভোগ
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, শাহীন আলীর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে বিভিন্ন থানায় অন্তত চারটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গোদাগাড়ী থানার মামলা নং-২৬, তারিখ ১০ আগস্ট ২০২১। এছাড়া পার্বতীপুর রেলওয়ে থানায় দায়ের করা মামলা নং-১ (তারিখ ১৯ মার্চ ২০২২, দায়রা নং-৬১৫/২৩), মামলা নং-২ (তারিখ ১৫ এপ্রিল ২০২২, দায়রা নং-৫৬৬/২৩) এবং মামলা নং-৩ (তারিখ ৪ জুলাই ২০২২, দায়রা নং-৩৯৫/২৩)।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব মামলার মধ্যে অন্তত দুইটিতে তিনি কারাভোগ করেছেন। একটি মামলায় দিনাজপুর কারাগারে এবং অপর একটি মামলায় রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে তিনি কারাভোগ করেন বলে জানা গেছে।
গরুর রাখাল থেকে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক?
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৫ বছর আগেও শাহীন আলী তার পিতার সঙ্গে গবাদিপশুর চিকিৎসা বা কবিরাজির কাজে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় গরু পরিবহন ও রাখালের কাজও করতেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, পরবর্তীতে তিনি মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন এবং অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুল সম্পদের মালিক হন।
স্থানীয় তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিজ গ্রামে তিনি কোটি টাকা ব্যয়ে একটি দোতলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। বাড়ির সঙ্গে রয়েছে দুটি গরুর খামার। এছাড়া তার মালিকানায় দুটি ট্রাক্টর, দুটি ১০ চাকার ট্রাক, একটি নোহা মাইক্রোবাস এবং শস্য মাড়াইয়ের মেশিন রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।
এছাড়া রাজশাহী মহানগরীর ডাবতলা এলাকায় প্রায় ১০ কাঠা জমির ওপর বাড়ি নির্মাণসহ নগরীর আরও কয়েকটি এলাকায় জমি ক্রয়ের তথ্য স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া গেছে। পাশাপাশি প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বিঘা কৃষিজমির মালিকানার অভিযোগও রয়েছে।
হুন্ডি কারবারের অভিযোগও
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, মাদক ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশ হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেন করা হয় এবং এ ধরনের নেটওয়ার্কের সঙ্গেও শাহীন আলীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে শাহীন আলীর ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
গোদাগাড়ী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, “মাদকবিরোধী অভিযান চলমান রয়েছে। ডিবি, পুলিশ, র্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সমন্বিতভাবে কাজ করছে। বড় পর্যায়ের অভিযুক্তদের বিরুদ্ধেও আইনগত সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রাজশাহী জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, “মাদক কারবারিদের নতুন করে তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। আমাদের তালিকায় শাহীনের নাম রয়েছে। অভিযানের পাশাপাশি অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে গোদাগাড়ীর আব্দুল্লাহ ও তারেক নামের দুই ব্যক্তির সম্পত্তি ক্রোক করা হয়েছে।”
রাজশাহী রেঞ্জের পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, “মাদকের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ক্রেতা, বিক্রেতা বা সেবনকারী-যেই হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান শূন্য সহনশীলতার। মাদক ব্যবসায়ীদের তথ্য সংগ্রহ ও আইনের আওতায় আনতে আমরা কাজ করছি।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, চলমান মাদকবিরোধী অভিযানের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে শুধু খুচরা কারবারি নয়, অভিযোগের মুখে থাকা বড় নেটওয়ার্ক ও তাদের সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করে আইনের আওতায় আনার ওপর।




