রামেবি ক্যাম্পাসের ১৯ কোটি টাকার স্থাপনা উধাও

প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬; সময়: ৬:১১ pm | 
খবর > লিড

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণ করা প্রায় ১৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকার স্থাপনা, সীমানা প্রাচীর, নলকূপ ও অন্যান্য অবকাঠামোর বড় অংশের কোনো হদিস মিলছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাবে নিলাম বাবদ জমা পড়েছে মাত্র ২০ লাখ ৪১ হাজার টাকা। ফলে প্রায় ১৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকার সম্পদ নিলাম ছাড়াই লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিশ্লেষণে জানা গেছে, ২০২৩ সালে নগরের সিলিন্দা মৌজায় ৬৭ দশমিক ৬৭ একর জমি অধিগ্রহণ করে রামেবি। জমির পাশাপাশি সেখানে থাকা পাকা, আধাপাকা ও টিনশেড ভবন, সীমানা প্রাচীর, নলকূপ, গভীর নলকূপ, সাবমারসিবল পাম্প এবং গাছপালার জন্যও ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রায় ১৯ কোটি ৬৭ লাখ ৯২ হাজার ৯৬৮ টাকা পরিশোধ করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বহিরাগত একটি চক্র এসব সম্পদ দখল ও অপসারণে জড়িয়ে পড়ে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এই লুটপাট আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে।

এর আগে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসে, অধিগ্রহণ করা প্রায় ২৫ হাজার গাছের মধ্যে নিলামে বিক্রি হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৬৪২টি। প্রায় ১৪ হাজার কলাগাছ বাদ দিলেও অবশিষ্ট প্রায় ৮ হাজার গাছের কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় গাছের পূর্ণাঙ্গ হিসাব জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে তথ্য চেয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

এবার একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামো নিয়েও। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অধিগ্রহণকৃত জমিতে দুটি তিনতলা, ছয়টি দোতলা, তিনটি একতলা এবং একটি নির্মাণাধীন দোতলা ভবনসহ মোট ১২টি পাকা ভবন ছিল। এছাড়া সাতটি আধাপাকা ও টিনশেড ঘর, একটি ইটের নির্মিত ‘মিষ্টির ঘর’, ছাদের ওপর তিনটি শেড, প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ৩৬টি সীমানা প্রাচীর, একাধিক নলকূপ, গভীর নলকূপ এবং ১০টি সাবমারসিবল পাম্প ছিল। বর্তমানে এসবের অধিকাংশের কোনো অস্তিত্ব নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গত বছরের ৯ জুলাই একটি নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। ওই নিলামে একটি দোকানঘর, দুটি তিনতলা ভবন, দুটি একতলা ভবন এবং একটি দোতলা রেস্তোরাঁ ভবন বিক্রি করা হয়। পরে এনআরবিসি ব্যাংকের ১০টি পে-অর্ডারের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব দপ্তরে মোট ২০ লাখ ৪১ হাজার টাকা জমা দেওয়া হয়। এর বাইরে অধিগ্রহণকৃত বিপুল পরিমাণ স্থাপনার কোনো নিলাম বা বিক্রির তথ্য পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটকে নামমাত্র মূল্যে কিছু স্থাপনা নিলামে দেওয়া হয়। বাকি স্থাপনাগুলো কোনো নিলাম ছাড়াই অপসারণ করা হয়েছে। এ কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা সুবিধা পেয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বর্তমানে ক্যাম্পাস এলাকায় একটি দোতলা ভবন ছাড়া অন্য কোনো স্থাপনা নেই। সেখানে এখন ভূমি ভরাটের কাজ চলছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা জানান, তারা কাজ শুরুর সময় সেখানে কোনো সীমানা প্রাচীর দেখেননি। তাদের ভাষ্য, বালু ভরাটের আগেই সবকিছু সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গত বছরের জুলাইয়ে নিলাম শুরু হলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভবন ভাঙার কাজ দ্রুতগতিতে চলে। এছাড়া তারও আগে সীমানা প্রাচীরের ইট খুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সে সময় শ্রমিকরা জানিয়েছিলেন, তারা অফিসের নির্দেশেই কাজ করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক উপাচার্য এবং ক্যাম্পাস নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান। তিনি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ভূমি উন্নয়ন, সীমানা প্রাচীর ও গেট নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভূমি উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অধিগ্রহণকৃত ক্যাম্পাস এলাকায় লুটপাট শুরু হয়।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও উপাচার্য অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক ফোন রিসিভ করেননি।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন পরিচালক নজিবুর রহমান বলেন, “আমি আট মাস আগে যোগদান করেছি। আগের বিষয়গুলো সম্পর্কে আমার জানা নেই। অধিগ্রহণের সময় ক্ষতিপূরণ হিসেবে যে মূল্য দেওয়া হয়, বাস্তবে নিলামে সেই পরিমাণ অর্থ পাওয়া যায় না। সে কারণেই প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্য নির্ধারিত স্থাপনা ২০ লাখ টাকায় বিক্রি হতে পারে। এটি আমার ব্যক্তিগত ধারণা।”

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন