৭১ ও ২৪ ভুলে গেলে চলবে না

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৫, ২০২৪; সময়: ৩:০৫ pm | 
খবর > মতামত

ড. জাহিদ দেওয়ান শামীম : সাম্য, সুশাসন, সমঅধিকার ও শোষণ-বঞ্চনামুক্ত একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলার দামাল ছেলেরা ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। এরপর দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ৩০ লাক্ষ শহীদ ও ৩ লাক্ষ মা-বোন সর্বোচ্চ ত্যাগ বিনিময়ে ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে দেশের অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ী হন।

বিজয়ের চুড়ান্ত ঊষালগ্নে আজকের এই দিনে দেশ ও জাতিকে মেধা শূন্য ও পঙ্গু করতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর দোসররা দেশের প্রথিতযশা শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক বিজ্ঞানীসহ বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের নৃশংসভাবে হত্যা করেছিলো। তারা মনে করেছিল জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করলেই এদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব দুর্বল হয়ে পড়বে এবং উন্নয়ন অগ্রগতি রুদ্ধ করে দেয়া যাবে। স্বাধীনতা অর্জন করলেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার পথে মুখ থুবড়ে পড়বে। কিন্তু তাদের সে লক্ষ্য ব্যর্থ হয়েছিল।

স্বাধীনতাত্তোর শাসকদল ও খুনিদের প্রেতাত্মারা বাংলাদেশে জনগণের মৌলিক ও মানবাধিকার খর্ব, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরন, গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের মাধ্যমে আইনের শাসন এবং গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। স্বাধীন দেশে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ৩ নম্বর আসামী স্টুয়ার্ড মুজীব প্রথম গুমের শিকার হন। কিন্তু কেনো এই মুক্তিযোদ্ধাকে গুম হতে হয়েছিল? এই দায়িত্বশীল নিষ্ঠাবান তেজোদীপ্ত যুবক স্টুয়ার্ড মুজীব ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে এবং পরে ৮ নং সেক্টরে যুদ্ধ করেছে। তার মত নির্ভেজাল মেধাবী একজন দেশপ্রেমিক যুদ্ধা সত্যিই বিরল। প্রচন্ড সহস ও বীরত্বের অধিকারী স্টুয়ার্ড মুজীব ছিল শেখ মুজিবের অত্যন্ত প্রিয় অন্ধভক্ত।

মাদারীপুর থানার অন্তর্গত পালং অধিবাসী মুজীব যুদ্ধের সময় বিদ্যুতের মতই এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত ছুটোছুটি করেছে। কি করে মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করা যায়, ভারতের কোন নেতার সাথে যোগাযোগ করলে মুক্তিযুদ্ধের রসদ লাভ করা যায় কেবল সেই চিন্তা এবং কর্মেই অস্থির ছিল স্টুয়ার্ড মুজীব। স্টুয়ার্ড মুজীব ভারতে অবস্থিত আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেক কুকীর্তি সম্পর্কেই ছিল ওয়াকিফহাল। এতবড় স্পর্ধা কি করে সইবে স্বার্থান্বেষী মহল। তাই স্বাধীনতার মাত্র সপ্তাহ খানিকের মধ্যেই ঢাকা নগরীর গুলিস্তান চত্তর থেকে হাইজ্যাক হয়ে যায় স্টুয়ার্ড মুজীব।

এভাবে হারিয়ে যায় বাংলার একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতার ঊষালগ্নে আরও এক গুমের শিকার হন “স্টপ জেনোসাইড” খ্যাত চলচ্চিত্রকার কাজী জহির রায়হান। জহির রায়হান যুদ্ধকালে পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন স্থানে কাজ করতে গিয়ে উদ্বাস্তু শিবিরে আওয়ামীলীগ নেতাদের অপকর্মের অনেক ফুটেজ ও ডকুমেন্ট সংগ্রহ করেন, যা দিয়ে তিনি ডকুমেন্টারী বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধপরবর্তী সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট পাপিষ্ঠরা এসব কারনে জহির রায়হানকে গায়েব করে দেয়, তার লাশটিও খুঁজে পাওয়া যায় নি। জহির রায়হান সংবাদ সম্মেলন করে এসব চিত্র প্রকাশের হুমকি দিয়েছিলেন। আর এ হুমকির পরই তাঁর গুমের ঘটনা ঘটে। জহির রায়হানের ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার যুদ্ধকালে ১৪ ডিসেম্বর হানাদার বাহিনীর দ্বারা অপহৃত হন।

১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারী ভাইকে খোঁজার নাম করে জহির রায়হানকে ডেকে নেয় স্বাধীন বাংলার প্রশাসনের পরিচিতরা। এরপর থেকে জহির রায়হান নিখোঁজ। মুজিব সকারের পুলিশ ও মিরপুর এলাকা নিয়ন্ত্রকারী বাহিনী জহির রায়হানের পরিবারকে সাহায্য করার পরিবর্তে এড়িয়ে যেতেন। জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া প্রসঙ্গে ৯নং সেক্টর কমান্ডার মেজর এম.এ. জলিল লিখেছেন, “মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের আওয়ামীলীগ নেতাদের কুকীর্তি ফাঁস করে দিতে চাওয়ায় নিখোঁজ হন সাংবাদিক জহির রায়হান। ভারত অবস্থানকালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের অনেক কিছুই জানতে চেয়েছিলেন স্বনামধন্য সাহিত্যিক এবং চিত্র নির্মাতা কাজী জহির রায়হান। তিনি জেনেছিলেন অনেক কিছু, চিত্রায়িতও করেছিলেন অনেক দুর্লভ দৃশ্যের। কিন্তু অতসব জানতে বুঝতে গিয়ে তিনি বেজায় অপরাধ করে ফেলেছিলেন। স্বাধীনতার ঊষালগ্নেই তাকে সেই অনেক কিছু জানার অপরাধেই গুম হতে হয়েছে।

ভারতের মাটিতে অবস্থান কালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের চুরি, দুর্নীতি, অবৈধ ব্যবসা, যৌন কেলেংকারী, বিভিন্ন রূপ ভোগ-বিলাস সহ তাদের বিভিন্নমূখী অপকর্মের প্রমাণ্য দলীল ও সচিত্র দৃশ্য ছিল। এটাই ছিল তার বড় অপরাধ। জহির রায়হানের এতবড় অপরাধকে স্বার্থান্বেষী মহল কোন যুক্তিতে ক্ষমা করতে পারে? তাই বেঁচে থেকে স্বাধীনতার পরবর্তী রূপ দেখে যাওয়ার সুযোগ আর হয়নি জহির রায়হানের। স্বাধীনতাত্তোর মুজিব সরকারের অপশাসন, বহুদলীয় গনতন্ত্রকে হত্যা করে একদলীয় বাকশাল কায়েম, ব্যাংক ডাকাতি, জনগনের নাগরিক স্বাধীনতা, ভোটাধিকার, মৌলিক ও মানবাধিকার খর্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য সিরাজ শিকদারসহ বিরোধী দলে পঁচিশ হাজার নেতাকর্মি বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হন।

স্বাধীনতাত্তোর সরকারের মত গত ১৫/১৬ বছর মুজিব কন‍্যা ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এক নতুন সংস্করণের চর্চা শুরু করেছে। যেখানে অপশাসন-দুঃশাসন, গুম-খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও ব্যাংক ডাকাতিসহ জনগণের নাগরিক স্বাধীনতা, ভোটাধিকার, মৌলিক ও মানবাধিকার খর্ব হচ্ছে। দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংগঠন ওমানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তথ্য মতে, গত১৫/১৬ বছরে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে ১৯২৬ জন। ফ‍্যাসিষ্ট হাসিনা সরকারের আমলে দেশ থেকে গড়ে প্রতি বছর ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচারের তথ্য উঠে এসেছে সম্প্রতি শ্বেতপত্রে। সেই হিসেবে গত ১৫/১৬ বছরে পাচার হয়েছে ২৪০ বিলিয়ন বা দুই লাখ ৪০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে – ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে তখন দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। গত আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এ ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে ব্যাপক লুটপাট আর অব্যবস্থাপনার কারণে সেই খেলাপি এখন দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের টানা তিন আমলে দেশের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৬২ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা। শতাংশে হিসাব করলে খেলাপি বাড়ার হার ১ হাজার ১৬৮ শতাংশ। এ ছিল গত ১৫/১৬ বছরে ভোটাধিকারহীন ফ‍্যাসিষ্ট শাসকগোষ্ঠীর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এক নতুন সংস্করণ। পক্ষান্তরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল লক্ষ্য ছিলঃ- স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ, এক উদারচেতা, পরমতসহিষ্ণু, সংস্কৃতিমনা সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং সুখি-সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়া।

স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে দেশের গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়েছে, জনগণের মৌলিক ও মানবিক অধিকার খর্ব হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই এদেশের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষ লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধার করেছে, এবার ২৪ সালেও এর ব্যাতিক্রম ছিল না। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে আগস্টের ৫ তারিখে বাংলাদেশ একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি লাভ করেছে। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভিকটিমের পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী, হাসপাতাল ও জাতীয় দৈনিক গুলোর সূত্র থেকে আমরা এ পর্যন্ত ৯৮৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছি। এর মধ্যে ৮৬৮ জনের নাম জানা গেলেও ১১৮ জনের নাম জানা সম্ভব হয়নি।

এছাড়াও গণমাধ্যম, হাসপাতাল ও বিভিন্ন মাধ্যমের তথ্য মতে নিহতের সংখ্যা কমপক্ষে ১২০০ জন। নিহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী, সাংবাদিক, পেশাজীবি, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, শিশু ও নারীসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থক রয়েছেন। আন্দোলনে কমপক্ষে ১২৭ জন শিশু, ৬ জন সাংবাদিক, ৫১ জন আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্য, এবং ১৩ জন মেয়ে শিশু ও নারী নিহত হয়েছেন। গত জুলাই ও আগষ্টের এই আন্দোলনকে সফল করতে বারো শতাধিক মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে ও পয়ত্রিশ সহস্রাধিক মানুষকে আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে। ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে ৫ই আগস্ট ভারতে পালিয়ে যান স্বৈরশাসক ফ‍্যাসিষ্ট হাসিনা।

এখন দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা করতে হবে। দেশের হারিয়ে যাওয়া আইনের শাসন, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং বহু দল-মত ও পথের রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তাই, ৭১ ও ২৪ ভুলে গেলে চলবে না। ৭১ সালে পাকিস্তানি শাসক ও তাদের দোসর রাজাকারদের সহায়তায় বাংলাদেশে নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। ২৪ সালে ভারতীয় শাসক ও ২৪ এর রাজাকারদের সহায়তায় দেশে নৃশংসতম হতাকান্ড সংগঠিত হয়। ৭১ সালের হত‍্যাকান্ড যেমন ইতিহাসের নির্মোহ সত‍্য, ২৪ সালের ছাত্র-জনতা হত‍্যাকান্ডও ইতিহাসের নির্মম সত‍্য। ৭১ ও ২৪ আমাদের জাতীয় জীবনে এক হার নামানা ইতিহাস। আমরা বাংলাদেশী ও বাংলাদেশ পন্থী, আমাদেরকে ৭১ ও ২৪ কে বার বার সামনে আনতে হবে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং দেশকে এগিয়ে নিতে।

লেখক : ড. জাহিদ দেওয়ান শামীম, সিনিয়র সাইন্টিষ্ট, নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন