রাজশাহীতে এবার বাড়ি দখলের চেষ্টার অভিযোগ সেই এসপির

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৩; সময়: ১০:০৬ অপরাহ্ণ |
রাজশাহীতে এবার বাড়ি দখলের চেষ্টার অভিযোগ সেই এসপির

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহীতে একজন পুলিশ সুপারের (এসপি) বাড়ি ভাড়া নিয়ে দখলচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানায় তিনি লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন। ওই পুলিশ কর্মকর্তার নাম আব্দুর রহিম শাহ চৌধুরী। তিনি বর্তমানে টাঙ্গাইলে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে এসপি (ট্রেনিং) পদে কর্মরত।

তবে এই এসপির বিরুদ্ধে বিধি বহির্ভূতভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে তা দখলে নেওয়ার চেষ্টা করার অভিযোগ উঠে। বিষয়টি তদন্ত করে গত ২ আগস্ট পুলিশ সুপার পদমর্যাদার এই কর্মকর্তাকে গুরুদণ্ড দেওয়া হয়। তার বেতন নিম্নতম গ্রেডে নামিয়ে আনা হয়েছিল। যারা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল তাদের বিরুদ্ধে তিনি এই অভিযোগ করেন।

এসপি আব্দুর রহিম শাহ চৌধুরী অভিযোগ, বাড়ি ভাড়া নিয়ে সেখানে নার্সিং ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা হয়েছে। সাত বছর ধরে ভাড়া না দেওয়ায় ২৪ লাখ টাকা বকেয়া পড়েছে। এমনকি নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য এবং এসপি রহিমের স্বাক্ষর জাল করে তাঁকে ওই ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান বানানো হয়।

বিষয়টির সুরাহা করতে না পেরে গত ২৯ আগস্ট এসপি রহিম রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। মহানগরীর ডিঙ্গাডোবা ব্যাংক কলোনির মনিরুজ্জামান বাবুল ও সদর হাসপাতাল কলোনি এলাকার বাসিন্দা শবনম মোস্তারি মমির বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করেন তিনি।

এসপি রহিম থানায় অভিযোগে উল্লেখ করেন, ২০১৬ সালে মমতা ট্রেনিং ইনস্টিটিউট নামের একটি প্রতিষ্ঠান চালু করেন মনিরুজ্জামান বাবুল ও শবনম মোস্তারি মমি। মহানগরীর বালিয়াপুকুর এলাকায় ইনস্টিটিউটের জন্য এসপি রহিমের বাড়িটি তাঁরা ভাড়া নেন। পরের বছরের মার্চে রহিম ভাড়া চাইলে মমি ও বাবুল কালক্ষেপণ করতে থাকেন।

কিছুদিন পর এসপি রহিম তাঁর বাড়ির কেয়ারটেকার সোহেল রানাকে ভাড়ার জন্য বাবুল ও মমির কাছে পাঠান। এ সময় বাবুল সোহেল রানাকে মারধর করেন এবং হত্যার হুমকি দেন। এ ঘটনায় তখন এসপি রহিম বাবুল ও মমির নামে বোয়ালিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

এ ঘটনার পর বাবুল ও মমি মমতা নার্সিং ইনস্টিটিউটের সঙ্গে এসপি রহিমকে সম্পৃক্ত করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে এসপি রহিমকে মমতা ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির কার্যনির্বাহী পরিষদের স্বাক্ষর জাল করে এসপি রহিমকে ওই ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান হিসেবে অনুমোদন করা হয়। এ ছাড়া এসপি রহিমের স্বাক্ষরও জাল করা হয়। রহিমের থানায় করা অভিযোগে বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, এসপি রহিম মমতা নার্সিং ইনস্টিটিউটের রেজুলেশনে স্বাক্ষর করেননি। এ ছাড়া এস এম কাজিম উদ্দিন, আব্দুল ওয়াহেদ, ডা. আশরাফুল হকসহ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকে চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়।

কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্যদের স্বাক্ষর জাল করে এসপি রহিমকে মমতা ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়। কার্যনির্বাহী পরিষদে অবৈধভাবে চেয়ারম্যান অনুমোদনের পর এসপি রহিমকে বাড়ি ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানান বাবুল ও মমি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এসপি রহিম বলেন, ‘নার্সিং কাউন্সিলে দাখিল করা মমতা ইনস্টিটিউটের কাগজপত্র থেকে জানতে পেরেছি, ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর আমার স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। বাবুল ও মমি আমার বাড়ি ভাড়া নিয়ে ভাড়া না দেওয়ার জন্য আমার ও কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্যদের স্বাক্ষর জাল করে আমাকে তাঁরা চেয়ারম্যান করেন। আমি তাঁদের কাছে ২৪ লাখ টাকা বাড়ি ভাড়া পাব। ভাড়া না দিয়ে তাঁরা আমার বাড়িটি দখল করে রেখেছেন।’

এসপি রহিম আরও বলেন, ‘তাঁরা আমাকে নানাভাবে হয়রানি করেছেন। বাড়ি ভাড়া, বাড়ির দখল ও স্বাক্ষর জাল করার প্রতিকার পাওয়ার জন্যই আমি তাঁদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেছি।’

মনিরুজ্জামান বাবুল, বাড়ি ভাড়া নিয়ে মমতা ইনস্টিটিউট করা হয়েছিল। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন পুলিশ সুপার আব্দুর রহিম শাহ চৌধুরী। পরে তিনি  প্রতিষ্ঠানটি দখল করে এবং জালিয়াতি করে প্রতিষ্ঠানের ১৭ লাখ টাকা আত্মসাত করেন। এ নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে অভিযোগ দেয়া হয়। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তদন্ত করে তাকে গুরুদণ্ড দেওয়া হয়। সেটা থেকে রেহায় পেতে আমাদের বিরুদ্ধে উল্টে মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছেন।

বোয়ালিয়া মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘বাবুল ও মমির প্রতারণার বিষয়ে একটি অভিযোগ পেয়েছি। ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে সত্যতা পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

উল্লেখ্য, বিধি বহির্ভূতভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে তা দখলে নেওয়ার চেষ্টা করায় পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা আব্দুর রহিম শাহ চৌধুরীকে গুরুদণ্ড দেওয়া হয়। তার বেতন নিম্নতম গ্রেডে নামিয়ে আনা হয়েছিল।

এসবির (স্পেশাল ব্রাঞ্চ) বিশেষ পুলিশ সুপারের দায়িত্বে থাকার সময় এ কাণ্ড ঘটিয়ে ছিলেন তিনি। তাকে তিন বছরের জন্য ‘নিম্নবেতন গ্রেডে অবনমিতকরণ’ গুরুদণ্ড দিয়ে গত ২ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল।

যাতে বলা হয়, আব্দুর রহিম শাহ চৌধুরী যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া রাজশাহীর বালিয়াপুকুর দেবীসিংপাড়ার জার্মিনেট প্লাজায় ‘মমতা নার্সিং ইনস্টিটিউট’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ভঙ্গ করেছেন। একই সঙ্গে চেয়ারম্যান ও ভবন মালিক হিসেবে ৩০ শতাংশ অংশীদার দাবি করা, মমতা নার্সিং ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কমিটির সদস্যদের সঙ্গে মতপার্থক্য ও তা দখল নেওয়ার চেষ্টারও অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

এ প্রতিষ্ঠানের (মমতা নার্সিং ইনস্টিটিউট) সদস্যদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করে তাকে কারণ দর্শানো হয়। ব্যক্তিগত শুনানির পর তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয় বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে।

এ তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে মতামত দেয়া হয়। পরে তাকে দ্বিতীয়বার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, এক্ষেত্রেও অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বিধিমালা অনুসারে তাকে আগামী তিন বছরের জন্য ‘নিম্নবেতন গ্রেডে অবনমিতকরণ’ গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
topউপরে