সাজা, মামলা, সম্পদের পাহাড়-তবু অধরাই মাদক সম্রাট আজাদ!

"হেরোইন-ইয়াবাসহ একাধিকবার গ্রেপ্তার, এক মামলায় ৩০ বছরের সাজা; চার মামলা বিচারাধীন, তবু এলাকায় দাপটের অভিযোগ-সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন।"

প্রকাশিত: জুলাই ১১, ২০২৬; সময়: ১২:৪০ am | 
খবর > রাজশাহী

নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকার ঘোষিত দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান চললেও রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে একাধিক মাদক মামলার আসামি এবং একটি মামলায় ৩০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত একজন ব্যক্তির প্রকাশ্যে চলাফেরা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের পরও তিনি এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গোদাগাড়ী পৌরসভার মহিশালবাড়ী সাগরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল কালাম আজাদ (৫০)। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তিনি সীমান্ত এলাকা কেন্দ্রিক মাদক চক্রের সঙ্গে যুক্ত। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সীমান্ত এলাকায় একসময় ভারতীয় চিনি বহনের কাজ করতেন আব্দুল কালাম আজাদ। পরে মাদক পরিবহনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন এবং ধীরে ধীরে নিজেই মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন। এরপর অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন বলে দাবি স্থানীয়দের।

সাতটি মাদক মামলা, একটিতে ৩০ বছরের সাজা
সংগ্রহ করা মামলা-সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত তিন দশকে তার বিরুদ্ধে অন্তত সাতটি মাদক মামলা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে এবং একটি মামলায় আদালত তাকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

নথি অনুযায়ী
১৯৯১ সালে রাজশাহীর কাশিয়াডাঙ্গা এলাকায় তৎকালীন বিডিআরের হাতে ২০০ গ্রাম হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হন। ১৯৯৩ সালে ঢাকার গাবতলীর একটি আবাসিক হোটেল থেকে হেরোইনসহ আটক হন। ২০০১ সালে সাভারে এক কেজি হেরোইনসহ ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। এছাড়া বর্তমানে চারটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।

এসবের মধ্যে রয়েছে, ২০ মে ২০১৫: আশুলিয়ায় র‌্যাবের হাতে ১ হাজার ৪০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার (মামলা নং-৩০)। ২০ মে ২০১৬: সাভারে ডিবির হাতে ৪ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার (মামলা নং-২২/১১৯)। ১৫ আগস্ট ২০১৭: লালবাগে একটি ফ্ল্যাট থেকে ১৪ হাজার ৬০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার (মামলা নং-৩০/৩৬২)। ১৬ মার্চ ২০২৩: গোদাগাড়ী থানায় ৭০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলা (মামলা নং-৩১)।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, ঢাকা মিরপুর থানার একটি মাদক মামলায় তিনি ৩০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হলেও বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।

সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন:

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাগরপাড়া গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেন, একসময় নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে উঠে এলেও বর্তমানে আব্দুল কালাম আজাদের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ রয়েছে।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সে মাদক ব্যবসা করে বর্তমানে তার চলাফেরা রাজার মতো। এই ব্যবসা করে সাহাব্দীপুর এলাকায় মা ব্রিকস্ নামে একটি ইটভাটা, জলাহার মৌজায় কৃষিজমি, এছাড়াও একটি পুরাতন বাড়িসহ মাটি ক্রয়।  মহিশালবাড়ি-সাগরপাড়া এলাকায় পৈত্রিক ভিটায় আনুমানিক আধাকোটি টাকা ব্যায়ে  নতুন বাড়ি নির্মাণ। যা এখনো অসম্পন্ন রয়েছে।  মহিশালবাড়ী গোরস্থান মার্কেটে ২৬ লক্ষ টাকায় দুটি দোকান ক্রয়। দুটি এফ-জেড ব্যান্ডের  দামি মোটরসাইকেল এবং ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলে এলাকায় প্রচলিত রয়েছে। আছে নামে বেনামে নগদ ক্যাশ আনুমানিক ৫ কোটি টাকা।  তবে এসব সম্পদের মালিকানা ও অর্থের উৎস সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক এলাকাবাসী বলেন, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় বড় মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। মামলা ও সাজা হলেও তারা আবার জামিনে বেরিয়ে আগের মতোই মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ তাদের। এলাকার একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে কেউ প্রকাশ্যে কথা বললে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে অনেকেই প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল কালাম আজাদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি রিসিভ না করায় বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

গোদাগাড়ী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, “মাদকবিরোধী অভিযান চলমান রয়েছে। ডিবি, পুলিশ, র‌্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সমন্বিতভাবে কাজ করছে। বড় পর্যায়ের অভিযুক্তদের বিরুদ্ধেও আইনগত সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

রাজশাহী জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, “মাদক কারবারিদের নতুন করে তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। আমাদের তালিকায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম রয়েছে। অভিযানের পাশাপাশি অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে গোদাগাড়ীর দুই মাদক কারবারির সম্পত্তি ক্রোক করা হয়েছে।”

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন