ফাহমিন জাফর : এক বীর শহীদের গল্পগাথা

আব্দুর রাজ্জাক

প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৫; সময়: ২:৪৬ pm | 
খবর > মতামত

শেখ ফাহমিন জাফর ২০২৪ এর স্বাধীনতা আন্দোলনের সম্মুখ সারির একজন আমরণ লড়াকু সৈনিক, একজন বীর শহীদ। রক্তাক্ত জুলাই এর ১৮ তারিখে প্রিয় দেশ-মাতৃকার আহ্বানে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিল।

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার তারাটিয়া গ্রামে ১০ মে ২০০৫ সালে ফাহমিনের জন্ম। নিম্ম মধ্যবিত্ত পরিবারে তিন সন্তান নিয়ে মা-কাজী লুলুল মাকমীন ও বাবা শেখ আবু জাফরের টানাপোড়েনের সংসার। বাবা রাজশাহীতে রুপালী ইন্সুরেন্স কোম্পানীর মধ্যম গোছের একজন কর্মকর্তা। তিন ভায়ের মধ্যে ফাহমিন ছিল সবার ছোট এবং অত্যন্ত মেধাবী। ২০১৫ সালে বাংলাদেশের প্রাচীন, বিখ্যাত ও দেশসেরা বিদ্যালয় রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে ৩য় শ্রেণিতে ভর্তি হয় সে।

২০২৩ সালে এ-প্লাস পেয়ে সাফল্যের সাথে এস.এস.সি পরীক্ষায় পাশ করে। বড়ছেলে শেখ ফারহান জাফর চাকরির সুবাদে থাকতো ঢাকার উত্তরার দক্ষিণখানে। মা ছোট ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ফাহমিনকে নিয়ে ঢাকায় চলে যায়। ফাহমিন টংগী সরকারী কলেজে ২০২৩–২০২৪ ব্যাচে একাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়।

পড়ালেখা ভালোমতই চালিয়ে যাচ্ছিল সে। একাদশ ইয়ার চেঞ্জ পরীক্ষা চলছিল। এর মধ্যে সারাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দানা বেঁধে উঠল। নিজেদের অধিকার তো বটেই, সার্বিক স্বাধীনতা ও সার্বোভৌমত্ব রক্ষার দৃপ্ত শপথে গর্জে উঠল তরুণ ছাত্রসমাজ। তার সাথে যোগ দিল সব শ্রেণি-পেশার আমজনতা। শুরু হলো রক্তাক্ত জুলাই আন্দোলন। সরকারের জেল-জুলুম-দমন-পীড়ন-নির্যাতন আর গুলির বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা যেন বারুদের স্ফুলিঙ্গ হয়ে জ¦লে উঠল। শ্লোগান উঠল –

তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার
কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার”

“দিয়েছি তো রক্ত, আরো দিব রক্ত
রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়”

“বুকের ভিতর অনেক ঝড়,
বুক পেতেছি গুলি কর।”

লীগ-পুলিশের গুলিতে নিহত হলো বেশ কয়েকজন ছাত্র। প্রতিবাদে সবাই রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। ঝাঁঝালো শ্লোগানের সাথে দাবী উঠল ‘আমার স্বাধীনতা ফিরিয়ে দাও।’ ফাহমিনও নেমে পড়ল সেই আন্দোলন-মিছিলে।

ভারী মিষ্টি চেহারা আর দুরন্ত-চঞ্চল আচারণের কারণে অতি অল্প সময়ে স্কুলে সবার নজর কাড়ে ফাহমিন। ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে ছিল তার সমান বিচরণ। কবিতা লিখতো তারুণ্য-কিশোর মনের উদ্দীপনাভরা মননশীলতার ছোঁয়া দিয়ে। তার চারপাশের চেনা জগতের সমকালীন নানা প্রসঙ্গ হয়ে উঠত তার কিশোর কবিতার উপজীব্য। ১৮ তারিখ শহীদ হওয়ার পর তার শার্টের পকেট থেকে রক্তভেজা একটি কাগজ পাওয়া যায় যাতে ‘স্বাধীনতা’ বিষয়ে কবিতা লিখা ছিল। কবিতায় আক্ষেপ আর জিজ্ঞাসায় ফুটে উঠে স্বাধীনতার বন্দীদশার ধ্রুব সত্যচিত্র।

“কেন স্বাধীন দেশের ছাত্রের রক্ত ঝরল?
কেন তাদের প্রাণ গেল?
কেমন স্বাধীনতা পেলাম?
কথা বলার স্বাধীনতা নেই

যেখানে আন্দোলনে গুলি ছোঁড়ে
আমরা কি তাহলে স্বাধীনতা পাই নি!
রক্ত দিলাম ফের স্বাধীন দেশে
তাই রক্ত দিয়ে আবার স্বধীনতা আনব।”

১৭ তারিখ রাতে পোস্ট করা অন্য একটি কবিতায় ফাহমিন লিখে-

“ছাত্র-জনতা তোমরা যেভাবে রুখে দিয়েছো
সেভাবে অনড় থেকে বাঁধ তেরি করো
সংবাদ শুনলাম
তোমাদের ভাঙতে এক লীগ নেমেছে রাস্তায়
কিছুটা প্রাচীন কালের শাসকের সৈন্যের মতো।
যারা নগ্ন চিন্তাবিদ, চাটুকার আর অন্যায়ের সাথী
তারা দাবিয়ে রাখতে চায়, ভাঙতে চায়
কিন্তু ভাঙবেনা তোমরা, তারা সামান্য
তোমরা বজ্র হয়ে বর্ষিবে তাদের উপর
তোমরা থেমোনা
বিপরীত শক্তি না থাকলে আন্দোলন যুদ্ধ, কার সাথে?
তারা শক্তি প্রয়োগ করলে
নিউটনের তৃতীয় সুত্রও প্রয়োগ হবে
তাই বলেই হোক আন্দোলন শুরু।

সে রাতে এভাবে একের পর এক রক্তলেখা চলতে থাকে ফাহমিনের। চোখে যেন কিছুতেই ঘুম আসে না তার। দৃষ্টির সীমানায় কেবলই দাবী আদায়ের সংগ্রাম-স্বপ্ন। ভাবে, ‘কখন সকাল হবে, ঝাঁঝাল শ্লোগানে শরীর-মিছিলে রক্তকম্পন শুরু হবে। বিশ্বকন্ঠে বজ্রনিনাদ উঠবে আবার আকাশ ভরে। স্বৈরাচারী, একনায়ক, দুর্নীতিবাজ, হিংস্র-রক্ত পিপাসু, মাদার অব মাফিয়া হাসিনা ও তার প্রভু ভারতের সর্বগ্রাসী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব আমি’ ফাহমিন সংকল্প করে আপন মনে।

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে রেডি হতে শুরু করে আন্দোলনে যাবার। মা বলে- ‘কি রে বেটা, এত সকালে উঠলি যে?’ ফাহমিন কবিতার সুরে উত্তর দেয়-

‘আমরা যদি না জাগি মা
কেমনে সকাল হবে
তোমার ছেলে উঠলে গো মা
রাত পোহাবে তবে।’

মা তার কথা শুনে আর মনে মনে হাসে। তুই কি সত্যিই মিছিলে যাবি? জানতে চাইল মা লুলুল মাকমীন। ‘হ্যাঁ, মা, আমাকে যেতে হবে। আমাদের দাবী আমাদেরকেই আদায় করতে হবে। আর এজন্য চাই সংগ্রাম। তাছাড়া ভবিষ্যৎ আমাদের অন্ধকার।’ মা বুঝে গেল, তার আদরের ছোট্র ছেলে মিছিলে যাবেই। দেশের অবস্থা ভয়ানক খারাপ। চারিদিকে গোলমাল, মারামারি, গুলির-বোমার বিকট শব্দ, বারুদের গন্ধ। গুম-খুন-জেল-জুলুম কী করছে না এ অত্যাচারী ডাইনি অবৈধ হাসিনা সরকার। মায়ের বুকে ভয়-শঙ্কার দোলাচল, অব্যক্ত বেদনা-রোদন মনের গহীনে। কখন যে কী হয়! চিল-শকুন-হায়েনার মত মানুষরূপী জানোয়ারের দল মর্ত-আকাশে দাপাদাপী করে বেড়ায় এখন। তারপরও মা মন শক্তকরে।

‘সকালের নাস্তাটা করে যা, বাবা। কখন ফিরবি তার তো ঠিক ঠিকানা নাই।’ কেমন যেন বিষন্ন কন্ঠে বলে মা। ‘আচ্ছা! মা, দাও। তোমার হাতের খাবার মিস করতে চাই না আমি।’ এ কথা বলে তাড়াতাড়ি খেয়ে কলেজের ইউনিফর্ম পরে আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে আন্দেলনে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হবে ফাহমিন। এমন সময় কী যেন মনে হল। থমকে দাঁড়ালো সে পিছন ফিরে, মায়ের দিকে মুখ করে। ভারী কন্ঠে মাকে বলল- ‘আমার জন্য দোয়া করো মা, আমি যেন এ সংগ্রামে সফল হয়ে ঘরে ফিরি। আর আমি যদি মারা যাই, মা, শহীদ হই, দাবী আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমার লাশ শহীদী স্থানেই যেন পড়ে থাকে। তুলে আনা না হয় যেন।’ মায়ের দোয়া নিয়ে ফাহমিন নতুন এক যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে পড়ে। মা অপলক ঝাপসা দৃষ্টিতে অদৃশ্য হওয়া পর্যন্ত ছেলের দিকে মুখ ফিরে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে দরজায় হেলান দিয়ে।

দুপুর একটা নাগাদ মা‘র মোবাইলে রিং বেজে উঠল। অমনি মায়ের বুকটা যেন অজানা আশঙ্কায় ধকধক করে উঠে। কাঁপাকাঁপা হাতে কল রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত হতে কে একজন মেডিকেল থেকে বলে উঠল- আপনার ছেলে ফাহমিন বেলা ১২.৩০টায় আজমপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে। রাস্তার পাশে এক মার্কেটের সিড়িতে গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত নিথর দেহ পড়ে আছে চিত হয়ে। ধবধবে সফেদ সাদা কলেজ পোশাক আজ স্বাধীনতার রক্তলালে রঞ্জিত। কথাটা শুনেই মা জননী যেন পাষাণ পাহাড়ের মতো স্তব্দ, নিশ্চল, নিশ্চুপ। চোখে সাত সাগরের জল ————।

মুহূর্তেই সকালে বিদায়বেলার দৃশ্য ভেসে উঠলো ঝাপসা চোখে। ভারাক্রান্ত মনে দুখিনী মা আল্লাহর নাম জপে নিঃশব্দে আর একবার দোয়া করে বলে ‘ হে আল্লাহ, আমার ফাহমিন দেশের জন্য, দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য নিজের জান কোরবান করেছে। আমার ফাহমিনকে তুমি শহীদ হিসেবে কবুল করে নাও। আমার প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বৈরাচারমুক্ত করে দাও, পাপাচারমুক্ত করে দাও, ভারতের দাসত্ব-শৃঙ্খলমুক্ত করে চিরকালের জন্য স্বধীন করে দাও। আমিন।’

গলায় ঝুলান সেই আইডি কার্ড লাল নিথর দেহের বুকের উপর রক্তমাখা অবস্থায় পড়ে থেকে সহযোদ্ধাদের জানিয়ে দিল এ বীর শহীদের ঠিকানা-

শেখ ফাহমিন জাফর
একাদশ শ্রেণি
বিজ্ঞান বিভাগ
আইডি নম্বর-২৩০১০৫১৬৪
সেশন: ২০২৩-২০২৪
টংগী সরকারি কলেজ
গাজীপুর।

স্বৈরাচারের পতন হলো। দেশ আবার স্বাধীন হলো। ফাহমিন, আবু সাঈদ, মুগ্ধরা হয়ে রইল ২০২৪ এর রক্তাক্ত জুলাইয়ের ইতিহাস। রক্তে কেনা এক নতুন বাংলাদেশ।

লেখক-সিনিয়র শিক্ষক (ইংরেজি), লেখক ও কবি নজরুল গবেষক, রাজশাহী।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন