সম্ভাবনার রাজশাহী: পরিকল্পনা ও উদ্যোগেই বদলে যেতে পারে নগর অর্থনীতি

নাগরিক, উদ্যোক্তা ও রাজনৈতিক উদ্যোগ মিলিয়ে রাজশাহী গড়ে উঠবে একটি স্মার্ট, মানববান্ধব এবং সম্ভাবনাময় শহর হিসেবে।

প্রকাশিত: মার্চ ১১, ২০২৬; সময়: ৪:১০ pm | 
খবর > বিশেষ সংবাদ

শফিকুল আলম সমাপ্ত : রাজশাহী- আম, রেশম ও শিক্ষার শহর হিসেবে পরিচিত। বরেন্দ্র অঞ্চলের উঁচু ভূমিতে অবস্থান, তুলনামূলক বন্যামুক্ত পরিবেশ এবং নির্মল বাতাস এই শহরকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের থেকে আলাদা করেছে। চারপাশে কৃষিপণ্য, পরিচ্ছন্ন নগর জীবন এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ এই শহরকে একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ এবং সম্ভাবনাময় নগরী হিসেবে গড়ে তুলেছে। তবুও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে- যে শহরের চারপাশে এত সম্পদ ও সম্ভাবনা, সেই শহরের শিক্ষিত তরুণরা কেন কর্মসংস্থানের খোঁজে ঢাকামুখী হবে?

সমস্যার মূলে শিল্প ও কর্মসংস্থান গড়ে ওঠেনি। অবকাঠামো ও সুবিধা থাকা সত্ত্বেও রাজশাহীতে পরিকল্পিত শিল্প উদ্যোগ নেই। শহরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং রেলপথে কম খরচে পণ্য পরিবহনের সুযোগ থাকলেও অভাব কেবল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগের।

রাজশাহীর অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায় হতে পারে কৃষিভিত্তিক শিল্পের প্রসার। শহরের উপকণ্ঠে ছোট ছোট খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় কৃষিপণ্যকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী শিল্পচক্র তৈরি হবে। টিটিসি বা যুব উন্নয়ন কেন্দ্রের মাধ্যমে তরুণদের ফুড প্রসেসিং, প্যাকেজিং ও রপ্তানি ব্যবস্থায় প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে তারা দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হবে।

এই তরুণরাই রাজশাহীর বিখ্যাত আম, টমেটো, মাছ প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করতে পারবে। উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। উদ্যোক্তাদের বাজার নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। পাশাপাশি স্থানীয় ব্যাংকগুলো সহজ শর্তে স্বল্পসুদে ঋণ দিলে পুঁজির অভাবে উদ্যোগ থেমে থাকবে না।

ফলে অনেক সুফল তৈরি হবে। কৃষক ন্যায্য মূল্যে তার উৎপাদিত ফসল বিক্রি করতে পারবেন, পচনশীল কৃষিপণ্য ভ্যালু-অ্যাডেড পণ্যে রূপান্তরিত হবে এবং স্থানীয় তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। রাজশাহীর আম যেমন আর শুধু কাঁচা ফল হিসেবে বিক্রি হবে না, বরং প্রক্রিয়াজাত পণ্য হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারেও জায়গা করে নিতে পারবে।

শিল্পের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা খাতেও রাজশাহীর সম্ভাবনা উজ্জ্বল। নির্মল পরিবেশ, তুলনামূলক কম বায়ুদূষণ এবং স্বাস্থ্যসম্মত আবহ শহরটিকে একটি সম্ভাবনাময় মেডিকেল হাবে পরিণত করতে পারে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে আধুনিক হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, নার্সিং ও মেডিকেল প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা গেলে রাজশাহী ধীরে ধীরে মেডিকেল টুরিজমে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। দেশের বিভিন্ন জেলা এবং পার্শ্ববর্তী দেশ থেকেও মানুষ চিকিৎসার জন্য রাজশাহীতে আসবে, যা স্বাভাবিকভাবেই মেডিকেল টুরিজমকে শক্তিশালী করবে।

পরিকল্পিত পর্যটনও শহরের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে-

পদ্মা নদীর তীর, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে ওয়াকওয়ে, পার্ক, নৌভ্রমণ ও বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে রাজশাহী উত্তরাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন নগরীতে পরিণত হবে।

শিক্ষা খাতেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। প্রাথমিক পর্যায়ে এলাকাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করলে শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠা নিশ্চিত হবে এবং সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হবে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত নিজ নিজ ওয়ার্ডের বিদ্যালয়ে পড়াশোনা বাধ্যতামূলক করলে দূরপাল্লার যাতায়াতের ঝুঁকি কমবে, ব্যয়ও কমবে এবং স্থানীয় স্কুলগুলোর মান উন্নয়নে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এগিয়ে আসবে। শিশুরা পরিচিত পরিবেশে বড় হবে, একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠবে।

নগর পরিকল্পনাতেও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ জরুরি। ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে সমন্বিত নগর পরিকল্পনা অপরিহার্য। প্রতিটি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ সংরক্ষণ, ক্রীড়া কার্যক্রম বাড়ানো এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন।

রাজশাহী কেবল একটি শহর নয়; এটি সম্ভাবনার শহর, যেখানে সঠিক উদ্যোগ ও পরিকল্পনা থাকলে দেশ-বিদেশের মানুষ চিকিৎসা, শিক্ষা ও পর্যটনের জন্য বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থান হবে, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনা প্রসারিত হবে এবং শহরের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।

আম, মাছ, টমেটো বা তৈরি খাদ্যপণ্য প্রসেসিংয়ে ছোট ছোট উদ্যোগ গড়ে তুলতে স্থানীয় ব্যাংকগুলোকে স্বল্পসুদে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি কোল্ড স্টোরেজ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানি সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। স্কুল, কলেজ ও শিক্ষণ উপকরণের উৎপাদন স্থানীয়ভাবে বাড়ানো হলে শহরের অর্থনীতি আরও চাঙ্গা হবে।

পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা, পর্যটন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং শিল্প- এই সব ক্ষেত্রের সমন্বয়ে রাজশাহীকে আমরা কেবল একটি শহর হিসেবে নয়, সম্ভাবনার নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি রাজশাহী গড়ে তোলা- যেখানে মানুষ চিকিৎসা নিতে আসবে আস্থা নিয়ে, যেখানে শিক্ষিত তরুণরা গর্ব করে বলতে পারবে- “আমি রাজশাহীতেই কাজ করি।”

সঠিক পরিকল্পনা, উদ্যোক্তা উদ্যোগ এবং নাগরিক অংশগ্রহণ থাকলে এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব। কৃষি ও শিল্পের সংমিশ্রণ, শিক্ষিত জনশক্তি ও পর্যটনের সুযোগ মিলিয়ে রাজশাহী হবে দেশের উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত ও স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্র।

সব মিলিয়ে বলা যায়, রাজশাহীকে আমরা যদি পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নিই- কৃষি ও শিল্পকে সংযুক্ত করি, শিক্ষার মান উন্নয়ন করি, পর্যটন ও স্বাস্থ্যসেবা প্রসারিত করি- তাহলে এটি সত্যিই হতে পারে দেশের অন্যতম উদ্ভাবনী, সবল এবং সম্ভাবনাময় নগরী। নাগরিক, উদ্যোক্তা ও রাজনৈতিক উদ্যোগ মিলিয়ে রাজশাহী গড়ে উঠবে একটি স্মার্ট, মানববান্ধব এবং সম্ভাবনাময় শহর হিসেবে।

লেখক: শফিকুল আলম সমাপ্ত, উদিয়মান তরুণ রাজনীতিবিদ ও আহবায়ক, রাজশাহী জেলা কৃষকদল।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন