শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, কী বলছেন আইন বিশেষজ্ঞরা

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণাকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি আইনাঙ্গনেও শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা কীভাবে দেশে ফিরবেন এবং ফিরে এলে আইনি প্রক্রিয়া কী হবে-এ নিয়েই চলছে নানা বিশ্লেষণ।
রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা রয়েছে তার। একই সঙ্গে নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারাও তার সঙ্গে দেশে ফিরবেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এ ঘোষণাকে রাজনৈতিক ‘স্ট্যান্টবাজি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, সরকার ইতোমধ্যেই তাকে ফিরিয়ে আনতে ভারতের কাছে আবেদন করেছে। তিনি দেশে এলে সরাসরি কারাগারে নেওয়া হবে। এরপর তিনি আপিল করলে আইন অনুযায়ী বিচারিক প্রক্রিয়া চলবে, আর আপিল না করলে আদালতের রায় কার্যকর হবে।
এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম মন্তব্য করেছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন ফাঁসির রায় কার্যকরের মুখোমুখি হওয়ার জন্যই।
আইনজীবীদের মতে, বৈধ পাসপোর্ট ছাড়া কোনো ব্যক্তি সাধারণভাবে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ করতে পারেন না। শেখ হাসিনার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল হওয়ায় দেশে ফিরতে হলে তার ট্রাভেল পাস প্রয়োজন হতে পারে। তবে সরকার ও ভারতের মধ্যে বিশেষ সমঝোতা হলে সামরিক বা বিশেষ ব্যবস্থায় ফেরার সুযোগও থাকতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ট্রাভেল পাস দেওয়া সম্পূর্ণ সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। সরকার অনুমতি না দিলে তার পক্ষে নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটে দেশে ফেরা সম্ভব হবে না।
অন্যদিকে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে ট্রাভেল পাসের বিষয়টি প্রযোজ্য নয়। কারণ তাকে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে ফেরানোর জন্য ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের বিধান থাকলেও আইনজীবীদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের বিধি অনুযায়ী বিলম্বের কারণ দেখিয়ে আপিলের আবেদন করা যায়।
আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, আদালত সন্তুষ্ট হলে বিলম্ব মঞ্জুর করে আপিল গ্রহণ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে আপিল গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে ট্রাইব্যুনালের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, অতীতেও দীর্ঘ সময় পর পলাতক আসামিদের আপিল গ্রহণের নজির রয়েছে। ফলে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও আদালত চাইলে সেই সুযোগ দিতে পারেন।
তবে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলায় দেওয়া আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রপক্ষ মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আপিল করেছে। সেই আপিলও বর্তমানে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত নভেম্বরে শেখ হাসিনাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন তিনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর বিমানবাহিনীর একটি উড়োজাহাজে করে তিনি ভারতে যান। এরপর থেকেই ভারতেই অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ সরকার তাকে ফিরিয়ে আনতে একাধিকবার ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি হত্যা করা হলেও তিনি নিজ দেশের মাটিতেই মৃত্যুবরণ করতে চান। তার ভাষায়, দলের নেতা-কর্মীরা বর্তমানে চরম নিপীড়নের শিকার এবং তাদের পাশে দাঁড়াতেই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।




