স্থবির ফ্ল্যাট বাজার, সংকটে নির্মাণ ও আবাসন খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের আবাসন খাত দীর্ঘদিন ধরে এক গভীর মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফ্ল্যাট বিক্রি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় চরম চাপের মুখে পড়েছেন ডেভেলপাররা। একই সঙ্গে নির্মাণসামগ্রীর বাজারেও দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। রড, সিমেন্ট, টাইলস, বালি, ইট ও পাথরের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের চাহিদা কমে যাওয়ায় পুরো খাতেই দেখা দিয়েছে অচলাবস্থা।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণ, ডলারের অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি এবং নির্মাণ ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি- সব মিলিয়ে আবাসন শিল্প এখন টিকে থাকার কঠিন লড়াইয়ে।
রিহ্যাবের তথ্য অনুযায়ী, একসময় মাসে গড়ে প্রায় এক হাজার ফ্ল্যাট বিক্রি হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ ইউনিটে। বিশেষ করে রাজধানীর গুলশান, বনানী, বসুন্ধরা ও ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট বিক্রি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে নির্মাণসামগ্রীর বাজারেও একই চিত্র। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত দুই বছরে বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। রাজধানীর বাংলামোটর, মিরপুর ও বাড্ডার বিভিন্ন বাজারে ক্রেতা সংকট স্পষ্ট। বাংলামোটর টাইলস মার্কেটের এক ব্যবসায়ী জানান, আগে যেখানে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার বিক্রি হতো, এখন কোনো কোনো দিন ৫০ হাজার টাকাও বিক্রি হয় না। এতে ব্যাংক ঋণের কিস্তি, গুদাম ভাড়া ও শ্রমিকের বেতন পরিশোধ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, গত কয়েক বছরে রড, সিমেন্ট, ইট, বালি ও পাথরের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে একটি ফ্ল্যাট নির্মাণে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সাধারণ ক্রেতারা ফ্ল্যাট কেনা থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। পাশাপাশি ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) কমে যাওয়ায় জমির মালিকরাও আবাসন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুর রাজ্জাক বলেন, “বর্তমানে পুরো আবাসন খাতই চাপে রয়েছে। বিক্রি ব্যাপকভাবে কমে গেছে, নতুন প্রকল্প গ্রহণও কমেছে। শুধু ডেভেলপার নয়, নির্মাণসামগ্রী ব্যবসায়ীরাও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, ব্যাংক ঋণের সুদহার বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক উদ্যোক্তার পক্ষে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি নির্মাণ ব্যয় বাড়লেও ক্রেতা কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আমিরুল হক বলেন, “সিমেন্ট শিল্পে বর্তমানে বড় ধরনের মন্দাভাব চলছে। চাহিদা কমে যাওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত থাকছে। শিল্প টিকিয়ে রাখতে সহজ শর্তে ঋণ ও নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।”
একই সংকটের কথা জানিয়েছেন ইস্পাত খাতের উদ্যোক্তারাও। জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল বলেন, আবাসন খাতের স্থবিরতার কারণে রডের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে বাধ্য হয়ে উৎপাদন কমাতে হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আবাসন শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় দুই কোটি মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। পাশাপাশি ১৬৯টির বেশি ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পও এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দীর্ঘমেয়াদি মন্দা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে গৃহঋণের সুদহার যেখানে ৯ শতাংশ ছিল, তা ২০২৪ সালে বেড়ে ১৭ শতাংশে পৌঁছায়। বর্তমানে তা কিছুটা কমে ১৪ শতাংশের আশপাশে থাকলেও উচ্চ সুদের কারণে মধ্যবিত্ত ক্রেতারা গৃহঋণ নিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশে আবাসন খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও বিশেষায়িত অর্থায়ন ব্যবস্থা সীমিত। সরকার চাইলে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ সুবিধা চালু করে এ খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসন খাত শুধু একটি শিল্প নয়, বরং দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এ খাত সচল থাকলে কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন ও রাজস্ব আয়- সবই বাড়ে। তাই দ্রুত নীতি সহায়তা, কর ছাড় ও সহজ অর্থায়নের ব্যবস্থা না নিলে সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।




