চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ভারতীয় গরুর ঢল

প্রকাশিত: মে ২৫, ২০২৬; সময়: ১২:০৪ pm | 
খবর > আঞ্চলিক

নিজস্ব প্রতিবেদক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ: কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে পদ্মা নদীপথে স্রোতের মতো ঢুকছে ভারতীয় গরু। রাত গভীর হলেই সীমান্তজুড়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে চোরাকারবারি চক্র। অধিক লাভের আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেকেই ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছেন। কেউ সীমান্তরক্ষীদের হাতে আটক হচ্ছেন, কেউ বিএসএফের গুলিতে নিহত বা পঙ্গু হচ্ছেন- তবু থামছে না গরু চোরাচালান।

সীমান্ত দিয়ে অবাধে ভারতীয় গরু প্রবেশে উদ্বেগ জানিয়েছেন স্থানীয় খামারিরা। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধিরাও। যদিও বিজিবির দাবি, চোরাচালান ঠেকাতে সীমান্তে তারা জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে।

সম্প্রতি ভারতীয় গরুর একটি চালান আসার তথ্য পেয়ে সীমান্তসংলগ্ন দুর্গম চরে অবস্থান নিয়ে দেখা যায়, রাত দেড়টার পর থেকেই বাড়তে থাকে চোরাকারবারি চক্রের নিয়োগ করা লাইনম্যানদের আনাগোনা। তাদের সংকেত পেয়ে রাখালরা একের পর এক গরু নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে। তবে ওই সময় সীমান্তে দায়িত্ব পালনরত কোনো বিজিবি সদস্যকে চোখে পড়েনি।

চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত রাখালদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করলে তারা অস্ত্র প্রদর্শন করে হত্যার হুমকি দেয় বলেও অভিযোগ ওঠে।

এদিকে সীমান্ত পথে দেদারসে ভারতীয় গরু ঢোকায় চরম ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় খামারিরা। তাদের দাবি, ঈদকে ঘিরে ধারদেনা ও ব্যাংক ঋণ নিয়ে গরু লালন-পালন করেছেন তারা। গোখাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর মধ্যে চোরাই পথে ভারতীয় গরু ঢোকায় লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা।

খামারিদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনেই চোরাই গরু হাটে বিক্রি হলেও প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। চোরাচালান বন্ধ না হলে অনেক খামারিকে পথে বসতে হবে বলেও আশঙ্কা তাদের।

শিবগঞ্জ উপজেলার আট রশিয়া গ্রামের ক্ষুদ্র খামারি পলাশ উদ্দিন জানান, সব পুঁজি বিনিয়োগ করে তিনি গরুর খামার গড়ে তুলেছেন। কিন্তু ভারতীয় গরুর কারণে বাজারে দাম পড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যে চাহিদার তুলনায় প্রায় এক লাখ টাকা কমে পাঁচটি গরু বিক্রি করতে হয়েছে তাকে। এখনও ছয়টি গরু অবিক্রীত রয়েছে।

তিনি বলেন, “সবচেয়ে বড় গরুটিও ন্যায্যমূল্যের অনেক কমে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি।”

একই উপজেলার কালুপুর গ্রামের খামারি জাহিদ হাসান জানান, তিনটি গরু হাটে তুলেও আশানুরূপ দাম পাননি। তার ভাষ্য, “গোখাদ্য ও পরিচর্যার খরচ বেড়েছে, কিন্তু ক্রেতারা যে দাম বলছেন তাতে তিনটি গরুতেই প্রায় ৩০ হাজার টাকা লোকসান হবে।”

কালুপুরের রশিদ ফার্মের এক শ্রমিক বলেন, গত বছর খামারের ১২টি গরুর সবই বিক্রি হয়েছিল। এবার এখনো একটিও বিক্রি হয়নি। খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, রোগবালাই ও অতিরিক্ত তাপমাত্রায় খরচ বেড়েছে, কিন্তু ভারতীয় গরুর কারণে বাজারদর কমে গেছে।

জেলার অন্যতম বড় খামারি আশরাফুল আলম রশিদ বলেন, অতিরিক্ত গরমে গরুর জন্য সার্বক্ষণিক ফ্যান ও পানির ব্যবস্থা করতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিল বেড়েছে। গত মাসে তীব্র তাপদাহে তার পাঁচটি গাভির বাছুর মারা গেছে। এর সঙ্গে টিকা সংকটও রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাইরে থেকে গরু আসলে খামারিরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে আশঙ্কা তার।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মুনজের আলম মানিক বলেন, করোনার পর থেকেই লোকসান গুনে খামার টিকিয়ে রেখেছেন জেলার খামারিরা। ভারতীয় গরুর কারণে সেই সংকট আরও গভীর হচ্ছে। তিনি খামারিদের সুরক্ষায় দ্রুত সরকারি উদ্যোগ দাবি করেন।

দি চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, সীমান্তে গরু আনতে গিয়ে প্রায়ই হতাহতের ঘটনা ঘটছে। অথচ চোরাচালান পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাতের অন্ধকারে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গরু সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করলেও সেগুলো জব্দ করা হচ্ছে। নাইট ভিশন ক্যামেরাসহ কঠোর নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা ও টহল জোরদারের মাধ্যমে জিরো টলারেন্স নীতিতে চোরাচালান প্রতিরোধে কাজ করছে বিজিবি।

এদিকে ভারতীয় গরুর চোরাচালান বৃদ্ধি পাওয়ায় সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল। তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি চোরাই গরু থেকে চাঁদা আদায়ের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্যমতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচ উপজেলায় এবার কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে দুই লাখ ২৬ হাজার ৫০টি পশু। বিপরীতে জেলার চাহিদা এক লাখ ৬৭ হাজার ২০২টি। ফলে স্থানীয় চাহিদার তুলনায় প্রায় ৫৮ হাজার ৮৪৮টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে, যা দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হবে।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন