সোশ্যাল মিডিয়ার আড়ালে কিশোর গ্যাং, বাড়ছে অপরাধের ঝুঁকি

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : একসময় কিশোরদের আড্ডা, খেলাধুলা ও সামাজিক যোগাযোগের প্রধান ক্ষেত্র ছিল পাড়া-মহল্লার মাঠ কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টিকটক, ইউটিউব এবং অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মে কাটছে তাদের অধিকাংশ সময়। তবে প্রযুক্তির এই ইতিবাচক ব্যবহারের আড়ালে উদ্বেগজনকভাবে বিস্তার লাভ করছে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রম।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে কিশোর গ্যাং সদস্যদের কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। র্যাবের তথ্যমতে, গত ছয় বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ১২৬ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ, সদস্য সংগ্রহ, প্রতিপক্ষকে হুমকি প্রদান এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা করত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রতিযোগিতা এবং ভার্চুয়াল পরিচিতির প্রভাব অনেক কিশোরকে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। টিকটক ভিডিও, লাইভ স্ট্রিম কিংবা বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে তারা কখনো কখনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে ‘সাহসিকতা’ বা ‘প্রভাব’ হিসেবে উপস্থাপন করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, বর্তমানে অল্প বয়সী শিক্ষার্থীরাও সহজেই স্মার্টফোন ও উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে তাদের সামাজিক আচরণ ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে কিশোররা পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভার্চুয়াল জগতের প্রতি অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
তার মতে, অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল ব্যবহার কিশোরদের মধ্যে আক্রমণাত্মক আচরণ, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং আইন অমান্যের প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে। বিদেশি সংস্কৃতি ও জীবনধারার অন্ধ অনুকরণও তাদের আচরণগত পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে শিশু ও কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে ফ্রান্সসহ ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ। পাশাপাশি বহু দেশে স্কুলে স্মার্টফোন ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে।
ইউনেস্কোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্মার্টফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা বা নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ক্লাস চলাকালে একটি নোটিফিকেশনও শিক্ষার্থীদের মনোযোগে উল্লেখযোগ্য বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রযুক্তিকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা সমাধান নয়। কারণ বর্তমান যুগে শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি দক্ষতা অর্জন এবং জরুরি যোগাযোগের জন্য ডিজিটাল মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাই প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মদ বলেন, অনেক শিক্ষার্থী স্মার্টফোন ব্যবহার করে অনলাইন শিক্ষা, বই পড়া কিংবা ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো ইতিবাচক কাজও করছে। ফলে প্রযুক্তির সুবিধাকে অস্বীকার না করে কিশোরদের মানসিক বিকাশ ও আচরণগত পরিবর্তন বোঝার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা রোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শিশুদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা ও পর্যবেক্ষণ জোরদার করতে হবে। অন্যথায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও বড় সংকট ডেকে আনতে পারে।




