জননিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে উন্নয়নের স্বপ্ন অধরাই থাকবে

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা। বিশ্লেষকদের মতে, নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে উন্নয়নের কোনো পরিকল্পনাই দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না।
তাদের মতে, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের অগ্রগতির পেছনে কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ ক্ষমতায় এসে অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। আন্তর্জাতিক সমালোচনা উপেক্ষা করেও তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, সেই নীতির সুফল আজও ভোগ করছে মালয়েশিয়া।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যাশা তৈরি হলেও, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দেশে মব কালচার ও আইনহীনতার নানা ঘটনা সামনে আসে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগ, সচিবালয় এবং শিল্প-সংস্কৃতির অঙ্গনেও অস্থিরতা তৈরি হয়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে জনজীবন ও অর্থনীতিতে।
এমন পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তি, নিরাপত্তা ও সুশাসনের প্রত্যাশায় জনগণ বিএনপিকে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিলেও এখনো কাঙ্ক্ষিত অবস্থায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে গত তিন মাসে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলেও তাদের পর্যবেক্ষণ।
এদিকে সরকারের প্রথম ১০০ দিনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ ও এপ্রিল- এই দুই মাসে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি, ১৯৬টি অপহরণ, পুলিশের ওপর ১২৯টি হামলা এবং ২ হাজার ২১৪টি চুরির ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩ হাজার ৪৯৬টি ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ধর্ষণের ঘটনাও রয়েছে।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সিভিল রাইটস সোসাইটি (বিসিআরএস)। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১ হাজার ১৪২টি হত্যাকাণ্ড, ৩৪৭টি অপহরণ, ১৮৪টি ছিনতাই এবং ৫৯১টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ৫ হাজার ৯৯৮টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সরকারের উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের রেখে যাওয়া প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সিভিল প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের একাংশ সরকারের নীতি বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত আন্তরিক নন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বিচার বিভাগের সংস্কার কার্যক্রমও প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সুপ্রিম কোর্ট ও অধস্তন আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এরই মধ্যে গত ২৩ জুন আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে দায়িত্ব পালনকারী ১৮ জন আইন কর্মকর্তা- ৭ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও ১১ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল- একযোগে পদত্যাগ করায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নিরাপদ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। শিল্প-কারখানায় অগ্নিসংযোগ, চাঁদাবাজি, সাংবাদিকদের ওপর হামলাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
বিশেষ করে গত ২৩ জুন রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে অপরাধ দমনে আরও কঠোর, কার্যকর ও নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে হবে। কারণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নয়ন ছাড়া দেশের টেকসই উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।




