২০৩০ সালে কি আবার সেই ধ্বংসযজ্ঞ?

প্রকাশিত: জুলাই ১, ২০২৬; সময়: ১১:০৭ am | 
খবর > আন্তর্জাতিক

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : আজ থেকে ১১৮ বছর আগে, ১৯০৮ সালের ৩০ জুন। সাইবেরিয়ার প্রত্যন্ত তুঙ্গুসকা অঞ্চলের আকাশ চিরে ধেয়ে এসেছিল এক রহস্যময় মহাজাগতিক বস্তু। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভয়াবহ বিস্ফোরণে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় প্রায় ২ হাজার ১৫০ বর্গকিলোমিটার বনাঞ্চল। লাখ লাখ গাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, মারা যায় অসংখ্য বুনো হরিণ। অথচ বিস্ময়করভাবে সেখানে কোনো গর্ত তৈরি হয়নি, এমনকি আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি উল্কাপিণ্ডের কোনো বড় অবশিষ্টাংশ।

ইতিহাসে এটি ‘তুঙ্গুসকা ঘটনা’ নামে পরিচিত। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এর রহস্য পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। তবে বিজ্ঞানীদের একটি ধারণা নতুন করে আলোচনায় এসেছে- যদি ওই বস্তুটি কোনো নির্দিষ্ট মহাজাগতিক বস্তুপুঞ্জের অংশ হয়ে থাকে, তাহলে তার আরেকটি অংশ ২০৩০ সালের জুনে পৃথিবীর কক্ষপথের কাছাকাছি ফিরে আসতে পারে।

তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেই বলছেন, এর অর্থ এই নয় যে ২০৩০ সালে আবার তুঙ্গুসকার মতো ধ্বংসযজ্ঞ ঘটবে। এটি কেবল একটি সম্ভাব্য বৈজ্ঞানিক ধারণা, নিশ্চিত কোনো পূর্বাভাস নয়।

যেভাবে ঘটেছিল রহস্যময় বিস্ফোরণ

১৯০৮ সালের ৩০ জুন স্থানীয় সময় সকাল সোয়া ৭টার দিকে একটি মহাজাগতিক বস্তু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। তুঙ্গুসকা এলাকায় তখন মানুষের বসতি ছিল খুবই কম। মূলত এভেনকি যাযাবর হরিণপালকেরাই সেখানে বাস করতেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে আকাশে দেখা যায় সূর্যের চেয়েও উজ্জ্বল একটি অগ্নিগোলক। এরপর ভয়াবহ আলোর ঝলকানি ও একের পর এক বজ্রধ্বনির মতো বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। বিস্ফোরণের তীব্রতায় মানুষ ছিটকে পড়ে, ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বহু মানুষ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, বস্তুটি প্রায় ৩০ ডিগ্রি কোণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার ওপরে বিস্ফোরিত হয়েছিল। অর্থাৎ এটি মাটিতে আঘাত করেনি; বায়ুমণ্ডলেই বিপুল শক্তি মুক্ত করে।

ঘটনাস্থল ছিল অত্যন্ত দুর্গম। ফলে প্রায় দুই দশক পর, ১৯২৭ সালে ভূবিজ্ঞানী লিওনিড কুলিক প্রথম সেখানে পৌঁছান।

তিনি বিশাল ধ্বংসস্তূপ দেখতে পেলেও কোনো গর্ত বা উল্কাপিণ্ডের বড় অংশ খুঁজে পাননি। পরে আকাশ থেকে তোলা আলোকচিত্রে দেখা যায়, বিস্ফোরণকেন্দ্রকে ঘিরে প্রজাপতির ডানার মতো আকৃতিতে লাখ লাখ গাছ উপড়ে পড়েছে। এই অস্বাভাবিক বিন্যাসই বিজ্ঞানীদের বুঝতে সাহায্য করে যে এটি ছিল একটি ‘এয়ারবার্স্ট’ বা বায়ুমণ্ডলীয় বিস্ফোরণ।

বিজ্ঞানীরা কী বলছেন?

নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অধ্যাপক মার্ক বসলোর মতে, তুঙ্গুসকার ঘটনাটি ছিল একটি ‘মেটিওরিটিক এয়ারবার্স্ট’। তবে সেটি গ্রহাণু ছিল নাকি ধূমকেতু -এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অন্যদিকে কানাডীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী অধ্যাপক মার্টিন কনোর্স বলেন, ঘটনাস্থল দুর্গম হওয়ায় তাৎক্ষণিক গবেষণা সম্ভব হয়নি। ফলে এ ঘটনা নিয়ে আজও অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা রয়ে গেছে।

২০১৩ সালে রাশিয়ার চেলিয়াবিনস্কের আকাশে আরেকটি মহাজাগতিক বস্তুর বিস্ফোরণ ঘটে। যদিও সেটি তুঙ্গুসকার তুলনায় অনেক ছোট ছিল, তবু বিস্ফোরণের অভিঘাতে হাজারো ভবনের কাচ ভেঙে যায় এবং বহু মানুষ আহত হন।

গবেষকদের মতে, চেলিয়াবিনস্কের ঘটনা প্রমাণ করেছে—বায়ুমণ্ডলীয় বিস্ফোরণ ধারণার চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক হতে পারে। তবে তুঙ্গুসকার বিস্ফোরণ চেলিয়াবিনস্কের তুলনায় অন্তত ১০ গুণ বেশি শক্তিশালী ছিল।

২০৩০ সালের ইঙ্গিত কতটা বাস্তব?

মার্ক বসলোর মতে, যদি তুঙ্গুসকার বস্তুটি পৃথিবীর সঙ্গে ৬১ বছরের কক্ষপথগত সম্পর্ক থাকা কোনো মহাজাগতিক বস্তুপুঞ্জের অংশ হয়ে থাকে, তাহলে এর অন্য অংশগুলো নির্দিষ্ট সময় পরপর ফিরে আসতে পারে। সে হিসাবে ১৯৬৯ সালের পর ২০৩০ সালের জুনে আবার এমন একটি বস্তু কাছাকাছি আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে তিনি নিজেই সতর্ক করে বলেছেন, এটি কেবল একটি বৈজ্ঞানিক অনুমান। এর অর্থ এই নয় যে পৃথিবীতে আঘাত হানবে বা তুঙ্গুসকার মতো আরেকটি বিপর্যয় ঘটবেই।

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন মহাকাশ সংস্থা পৃথিবীর নিকটবর্তী গ্রহাণু ও ধূমকেতুর ওপর নিয়মিত নজরদারি চালাচ্ছে। ভবিষ্যতে ‘নিও সার্ভেয়ার’সহ নতুন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু হলে এ ধরনের মহাজাগতিক বস্তুকে আরও আগে শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন