রাজশাহীতে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে মাদক মামলার জট

সারা দেশের মধ্যে একক জেলা হিসেবে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ৬৭১টি মামলা বিচারাধীন; সাক্ষী সংকট, তদন্তে বিলম্ব ও দীর্ঘসূত্রতায় বাড়ছে মামলাজট।

প্রকাশিত: জুলাই ৮, ২০২৬; সময়: ২:৩৫ pm | 
খবর > রাজশাহী

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকলেও বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতিতে রাজশাহীতে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে মাদক মামলার জট। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, একক জেলা হিসেবে সারা দেশে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ৬৭১টি মাদক মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে রাজশাহীতে। ফলে বিচারপ্রত্যাশী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আদালত-সব পক্ষই বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে।

সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সারা দেশে বিচারাধীন মাদক মামলার সংখ্যা ৮০ হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে রাজশাহীর মামলার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলার প্রায় ৩৯ হাজার এবং ঢাকা মহানগরের প্রায় ১৮ হাজার মামলা।

আইনজীবীদের মতে, মামলাজটের অন্যতম কারণ নির্ধারিত তারিখে সাক্ষী উপস্থিত না হওয়া এবং নিয়মিত সাক্ষ্যগ্রহণ না হওয়া। আদালতের ধার্য করা তারিখে অনেক সময় সাক্ষী আসেন না, আবার বারবার সমন জারির পরও তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ফলে বছরের পর বছর মামলাগুলো ঝুলে থাকে।

রাজশাহী বারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সালাহউদ্দিন বিশ্বাস বলেন, সাক্ষীদের আদালতে হাজির করে সাক্ষ্যগ্রহণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রপক্ষের। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কার্যকর তৎপরতার অভাব রয়েছে। সময়মতো সাক্ষ্যগ্রহণ না হওয়ায় মামলাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকছে।

আট বছরেও শেষ হয়নি একটি মামলা

২০১৮ সালের ১০ জুলাই গোদাগাড়ীর সুলতানগঞ্জ এলাকা থেকে ১ কেজি ২১০ গ্রাম হেরোইনসহ নুরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তার বিরুদ্ধে আরও তিনটি মাদক মামলা রয়েছে। বর্তমানে মামলাটি রাজশাহী বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন।

প্রায় আড়াই বছর আগে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলেও ১৪ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র দুজন সাক্ষ্য দিয়েছেন। বাকিরা একাধিকবার সমন পেয়েও আদালতে হাজির হননি। এদিকে জামিনে মুক্তি পাওয়া আসামিও নিয়মিত হাজিরা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে মামলাটি এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।

এমন উদাহরণ রাজশাহীর আদালতগুলোতে হাজার হাজার। নতুন মামলা যুক্ত হলেও পুরোনো মামলার নিষ্পত্তির গতি অত্যন্ত ধীর হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে মামলার পাহাড়।

কোন আদালতে কত মামলা

ডিএনসি সূত্রে জানা গেছে-

  • চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অধীনে বিচারাধীন ৬,৭৪৯টি মামলা।

  • মহানগর দায়রা জজ আদালতের অধীনে ৭,১৬০টি মামলা।

  • চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৯,৩৫৫টি মামলা।

  • জেলা ও দায়রা জজসহ অন্যান্য আদালতে ৩,৬০৭টি মামলা বিচারাধীন।

এ ছাড়া বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ও বিশেষ আদালতেও বহু মামলা বছরের পর বছর ঝুলে রয়েছে।

অভিযান চলছে, বাড়ছেও মামলা

শুধু চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসেই রাজশাহীতে বিভিন্ন সংস্থার মাদকবিরোধী অভিযানে শত শত ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং নতুন করে শত শত মামলা হয়েছে।

দুই মাসে ডিএনসি ২৬৯টি অভিযানে ১৪২ জনকে গ্রেপ্তার করে ১৫৪টি মামলা দায়ের করেছে। জেলা পুলিশ ৪৮৩টি অভিযানে ১২৯ জনকে গ্রেপ্তার করে ৯৪টি মামলা করেছে। মহানগর পুলিশ ৭৬৯টি অভিযানে ১৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করে ১২৫টি মামলা দায়ের করেছে। একই সময়ে বিজিবি ও র‌্যাবও অসংখ্য অভিযান পরিচালনা করে মাদক উদ্ধার ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম চালিয়েছে।

বিশেষ ট্রাইব্যুনালের দাবি

আইনজীবীদের মতে, বর্তমান গতিতে বিচার চললে মামলাজট কমানো সম্ভব নয়। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, সাক্ষী হাজিরে জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং তদন্ত ও প্রসিকিউশনের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন।

তবে রাজশাহীর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট রইসুল ইসলাম রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের এককভাবে দায়ী করতে রাজি নন। তার ভাষ্য, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষী হাজিরে পুলিশের অসহযোগিতা, আসামিপক্ষের সময়ের আবেদন এবং আদালতের ব্যস্ততা-সব মিলিয়েই মামলার জট তৈরি হয়েছে। এই সংকট নিরসনে পুলিশ, প্রসিকিউশন, বিচার বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

এদিকে জেলা মাদক নিয়ন্ত্রণ ও প্রচার কমিটির সভাপতি এবং জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, যৌক্তিক সময়ের মধ্যে কীভাবে বিপুলসংখ্যক মাদক মামলার নিষ্পত্তি করা যায়, সে বিষয়ে আগামী কমিটির সভায় বিস্তারিত আলোচনা করা হ

পদ্মাটাইমস ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন